স্ট্রোক : কীভাবে আটকাতে পারেন! জানতে লিংকে ক্লিক করুন

স্ট্রোক : কীভাবে আটকাতে পারেন! জানতে লিংকে ক্লিক করুন

পাঠকের কলমে,বেঙ্গল রিপোর্ট:
ছোটবেলায় একদিন বাড়ি ফেরার পথে দেখলাম রাস্তার উপর অনেক মানুষের ভিড়।দেখে মনের কৌতূহলে ছুটে যায় সেই দিকে।লোকে ঠাসা ভিড় ঠেলে ভিড়তে পৌঁছানোর চেষ্টা করেও অপারগ।কৌতূহল নিবারণে একজনকে জিজ্ঞাসা করে ফেললাম কাকু এত ভিড় কেন?,সপাটে উত্তর “হঠাৎ স্ট্রেকে মারা গেছে লোকটা।তাই বুঝি!তখন এত সব কঠিন শব্দ না বুঝলেও লোক মুখে বহু শুনেছি। যদি অল্প বয়সে অস্বাভাবিকভাবে মারা যায় আর যদি মৃত্যুর কারন ঠিকঠাক ভাবে কারোর জানা না থাকে তাহলে সবার মুখে একটাই কথা ঘুরে বেড়ায়, সেটি হল ‘স্ট্রোক ‘!লোকটি হঠাৎ স্ট্রেকে মারা গেছে। বহুল প্রচারিত কথা এগুলো।১৯ শে অক্টোবর ছিল বিশ্ব স্ট্রোক দিবস।

ওয়ার্ল্ড স্ট্রোক অর্গানাইজেশন (WSO), এই দিনটিকে বেছে নিয়ে প্রতিবছরে স্ট্রোকের কারণ, চিকিৎসা, প্রতিকারের উপায় আক্রান্তের দৈনন্দিন জীবনে ফিরিয়ে আনতে সারা বিশ্বব্যাপী সচেতনতার কর্মসূচি পালন করে।২০১০ সাল থেকে ‘One in six camping’ স্লোগানের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দেওয়া যে প্রতি ছয়জনের মধ্যে একজনের জীবন কালের যেকোনো সময় স্ট্রোক হতে পারে। তারপর থেকে ‘Because I care…..’ শ্লোগানের মাধ্যমে প্রতিবছর নিয়মমাফিক সচেতনতা কর্মসূচি পালন করা হয়।
এখন জানতে হবে স্ট্রোক জিনিসটা কি।স্ট্রোক একধরনের অপ্রতিরোধ্য রোগ যেটি ছোঁয়াচে রোগের মধ্যে পড়ে না।অর্থাৎ একজনের থেকে অন্য জনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েনা। প্রতিবছর সারা বিশ্বব্যাপী ১৮ মিলিয়ন মানুষ স্ট্রোকে মারা যান। যাদের মধ্যে ৭ মিলিয়ন মানুষ মারা যান এবং ৫ মিলিয়ন মানুষের স্থায়ী প্রতিবন্ধকতা জড়িয়ে ধরে।প্রতিবছর প্রায় ১৫ লক্ষ মানুষ স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়। এক সমীক্ষায় জানা গেছে সারা পৃথিবীতে এখনো প্রায় ৮০ মিলিয়ন মানুষ স্ট্রোকে আক্রান্ত জীবিত আছেন যাদের প্রায় ৫০ মিলিয়ন কি প্রতিবন্ধকতায় ভুগছে।

এবার জেনে নেব স্ট্রোক কি কি ধরনের ও তার কারণ। স্ট্রোক মূলত দুই ধরনের ইশমেচিক ও হিমারেজিক স্ট্রোক।অর্থাৎ সোজা ভাষায় ইশমেচিক স্ট্রোকে ব্রেনে রক্ত চলাচল কমে যায় আর হেমারেজিক স্ট্রোকে ব্রেনে রক্তক্ষরণ হয়।বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ইশমেচিক স্ট্রোক দেখা যায়। স্ট্রোকের কারণ হিসাবে যেটি বেশি ভাবা হয় উচ্চ রক্তচাপ ও অধিক পরিমাণে রক্তে কোলেস্টেরল।কোলেস্টেরল ফ্যাটের পরিমাণ বেড়ে গেলে সেগুলো রক্তনালীতে জমাট বেঁধে রক্তনালীগুলোকে আবদ্ধ করে দেয় যার ফলে মস্তিষ্কে রক্ত চলাচল হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়।আবার যাদের উচ্চ রক্তচাপ তাদের ক্ষেত্রে রক্তনালি ছিঁড়ে অধিক রক্তক্ষরণ হতে পারে বা রক্তনালীর দুর্বলতার ফলে (অ্যানিউরিজম) রক্তনালী ছিঁড়ে যায়।তবে সুসংবাদ হল এই যে, দিয়ে স্ট্রোকের কারণ গুলো সঠিকভাবে বুঝতে পারা যায় আর তৎক্ষণাৎ হাসপাতালে ভর্তি করা যায় তাহলে মৃত্যুর সম্ভাবনা অনেকটা কমে সাথে সাথে মস্তিষ্কের ক্ষতির পরিমাণ ও কমে। তাই আমাদের দ্রুত লক্ষণ দেখে অযথা আতঙ্ক সৃষ্টি না করে তাড়াতাড়ি সম্ভব হাসপাতলে ভর্তি করতে হবে। যদি দেখা যায় কারোর হঠ্যাৎ চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে,মাথা যন্ত্রণা হচ্ছে,শরীরের কোন একদিকে বা উভয়দিকের হাত-পা অসাড় বা দুর্বল হয়ে যাচ্ছে,কথা বা হাসতে গেলে রুগির মুখ এক দিকে বেঁকে যাচ্ছে,রুগির নাম অথবা অবস্থান সম্পর্কে ওয়াকিবহল না থাকে অথবা কথা বলতে সমস্যা হয় তাহলে অপেক্ষা না করে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে তৎক্ষণাৎ। রোগী জ্ঞান হারিয়ে ফেলতে পারে তাই রুগীকে চোখে চোখে রাখতে হবে সর্বদা।

মনে রাখা জরুরি সঠিক সময় সঠিকভাবে চিকিৎসা শুরু করতে পারলে মৃত্যুর ঝুঁকি অনেকাংশেই কমানো যায়।এবার আসা যাক এই স্ট্রোক প্রতিরোধের উপায়ের কথায়। খুব সহজে নিজের প্রতি একটু যত্নবান হলে স্ট্রোকের মতো মারনরোগের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, নিম্নলিখিত কাজগুলো সঠিকভাবে মেনে চললে স্ট্রোকের সম্ভাবনা অনেকটা কমে যায়।যথা-
উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করা।যাদের রক্তচাপ বেশি ডাক্তারের পরামর্শ মত নিয়মিত ওষুধ খেয়ে যেতে হবে।৪০ বয়োসোর্ধ প্রত্যেকের নিয়মিত রক্তচাপ পরিমাপ করাতে হবে কারণ উচ্চ রক্তচাপের লক্ষণ সহজে বোঝা যায় না।
নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে। দিনে অন্তত ৩০ মিনিট জোরে হাঁটা বা সাইকেল চালানোর মত ঘাম ঝরানো কাজ করতে হবে।সপ্তাহ হিসাবে তিন ঘন্টা করতে হবে।
প্রতিদিন সুষম প্রোটিন যুক্ত খাদ্য খান (ফল ও সবজি বেশি করে)উচ্চ প্রোটিনযুক্ত খাবার বেশি পরিমাণে কিন্তু ফ্যাট বা কোলেস্টেরল যুক্ত খাদ্য নৈবচ।সোডিয়াম যুক্ত খাবার যেমন লবণ কম খান কারণ রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়। আপনার রক্তে কোলেস্টেরল নিয়মিত পরীক্ষা করুন।বেশি থাকলে ডাক্তারের পরামর্শে হ্রাস করুন। উচ্চতার সাথে আপনার ওজন সঠিক রাখা অত্যন্ত জরুরী (বডি মাস ইন্ডেক্স)।ভারতীয়দের ক্ষেত্রে(১৮-২৩)এর মধ্যে থাকা ভালো।ধূমপান একেবারেই না,কারণ ধুমপানে ক্ষতিকারক রাসায়নিক যেমন কার্বন মনোক্সাইড নির্গত হয় সেটি রক্তনালীতে চর্বি জমতে সাহায্য করে।
মদ খাওয়া একেবারেই বন্ধ করুন।
নিয়মিত হার্টের সুস্থতার জন্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করুন প্রয়োজনে চিকিৎসা করাতে হবে। ডায়াবেটিস ও মধুমেহ রোগের জন্য নিয়মিত রক্তের শর্করার পরিমাপ করতে হবে।নিয়মিত ওষুধ ইনসুলিন প্রয়োগে শর্করা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। স্ট্রোক সম্পর্কে সাধারণ মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধির সাথে সাথে লক্ষণ ও প্রতিরোধের উপায় সম্পর্কে প্রচার অভিযান চালিয়ে যেতে হবে।আক্রান্তরা অনেকাংশে মস্তিষ্কের অপরিবর্তনশীল ক্ষতির কারণে স্থায়ীরূপে বিকলাঙ্গ হতে পারে তাদের প্রতি বেশি বেশি সামাজিক দায়বদ্ধতা দেখাতে হবে। নিয়মিত চিকিৎসা,ব্যায়াম খরচ যোগান ও মানসিকভাবে ভেঙে না পড়ে তার জন্য নিয়মিত কাউন্সেলিং করতে হবে।সব শেষেই বলি আপনার স্বাস্থ্য আপনার সম্পদ।এই সম্পদ টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব একমাত্র আপনারই। স্বাস্থ্যচর্চা হল সু-স্বাস্থ্যের চাবিকাঠি।

মেহেদী হাসান মোল্লা
বটতলা,গোসাবা

Facebook Comments