এইচআইভি সম্পর্কে ভুল ধারণার বদল চাই

এইচআইভি সম্পর্কে ভুল ধারণার বদল চাই

পাঠকের কলমে,বেঙ্গল রিপোর্টঃ
১ লা ডিসেম্বর, বিশ্ব এইডস দিবস।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংখ্যার উদ্যোগে ১৯৮৮ সালে প্রথম এই সচেতনতা মূলক এইডস দিবসের সূচনা হয়েছিল।এই বছর তিরিশ তম বর্ষ পালিত হতে চলেছে।এ বছরের প্রতিপাদ্য হল ‘Know your status’ অর্থাৎ আপনিও আক্রান্ত কিনা সেই অবস্থা জানুন।কেন এমন উদ্যোগ!তাহলে সত্যিই কি এইডস আক্রান্ত হলে জানা যায় না? উত্তর হল সচেতন হলেই জানা যায়।আর বেশিরভাগ মানুষ সচেতন নয় বলেই এই অভিনব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবছর।প্রতিটি মানুষের এইডস সম্পর্কে জানা উচিৎ।কারন এইডস এ আক্রান্ত হলে সহজেই লক্ষন বোঝা যায় না।

একেবারে শেষ পর্যায়ে লক্ষন ধরা পড়ে।এখন জানা যাক কি এই এইডস রোগ।এইডস হল একপ্রকার ভাইরাস ঘটিত রোগ।হিউম্যান ইমিউনোডেফিসিয়েন্সি ভাইরাস(এইচ আই ভি) এর প্রভাবে এই রোগের বিস্তার ঘটে।নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে কতটা ভয়ঙ্কর মাত্রা নিতে পারে এই রোগ।কারন মানুষের রোগ প্রতিরোধের যে অনাক্রম্যতন্ত্র আছে সেটাকেই অকেজো করে দেয়।ভাবুন যদি দেশের সীমানায় দাঁড়িয়ে থাকা সশস্র রক্ষীবাহিনী যদি অকেজো হয়ে যায় তাহলে বাইরের শত্রু অনায়াসে দেশের মধ্যে প্রবেশ করে যাবে।ঠিক তেমনি মানব শরীরেও এমন সশস্র বাহিনী হল এই অনাক্রম্যতা যেটি বাইরের জীবানুকে ধ্বংস করে রোগমুক্ত করে।আর এইচ আই ভি ভাইরাস সেই অনাক্রম্যতাকে নষ্ট করে দেয় ফলে আক্রান্ত ব্যাক্তির রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা কমে যায়।গোদের উপর বিষ ফোঁড়া। বাসা বাঁধে অন্যান্য মারন রোগ যেমন টিউবারকুলোসিস,ক্যান্সার,হেপাটাইটিস ইত্যাদি।একসময় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে আক্রান্তরা।ইউ এন এ আই ডি এস -এর তথ্য অনুযায়ী ২০১৭ সাল অব্দি বিশ্বে মোট এইডস আক্রান্তের সংখ্যা ৩৬.৯ মিলিয়ন।তারমধ্যে ২১.৭ মিলিয়ন চিকিৎসাধীন।

২০১৭ সালে নতুন করে আক্রান্তের সংখ্যা ১.৮ মিলিয়ন মানুষ।আর ২০১৭ সালে এইডস এর কারনে মারা গেছে প্রায় ১.১ মিলিয়ন মানুষ।ওই সংস্থ্যার তথ্যানুযায়ী ভারতে ২০১০ থেকে ২০১৭ সাল অব্দি এইডস আক্রান্তের সংখ্যা কমলেও ২০১৭ সালের পর থেকে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে।৮০ হাজার আক্রান্ত থেকে বেড়ে হয়েছ ৮৮ হাজার।আর মৃতের সংখ্যা ৬২ হাজার থেকে বেড়ে হয়েছে ৬৯ হাজার।আরো উদ্বেগজনক তথ্য হল ভারতে মোট ২.১ মিলিয়ন মানুষ এইডস এ আক্রান্ত যাদের মধ্যে ৭৯ শতাংশ তাদের রোগ সম্পর্কে জানেন এবং যারা জানেন তাদের মধ্যে মাত্র ৫৬ শতাংশ মানুষ চিকিৎসা করান।এই তথ্য সত্যিই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির সাক্ষ্য দেয়।মানুষ জানার পরেও চিকিৎসা নিতে অস্বীকার করেন।এর মূল কারন হিসাবে সামাজিক ব্যবস্থাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন অনেকে।আজও মানুষ এইডস আক্রান্ত রোগী দেখলে মুখ ঢাকা দেন, বিরূপ চিন্তাভাবনা পোষণ করেন।প্রশ্ন ওঠে তার স্বভাব চরিত্র নিয়েও।কিছুদিন আগে এক এইডস আক্রান্ত মহিলা পম্পা দত্তের ইন্টারভিউ শুনছিলাম।অবাক হয়ে গেলাম তাঁর জীবন যুদ্ধের লড়াকু মনোভাব শুনে।তিনিও এই একই সমস্যার ভুক্তভোগী ছিলেন।তাঁর স্বামী এইডস এ আক্রান্ত হয়েছিলেন কিন্তু পম্পা দত্তকে জানাননি তিনি।মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার সময় জানাজানি হয়। কিন্তু ততদিনে পম্পা দত্ত আক্রান্ত হয়ে গেছেন। এমন অনেক পম্পা দত্ত সমাজে ছড়িয়ে আছে। যারা কোন এক সামাজিক ব্যবস্থার ভুক্তভোগী।

এটা সমাজের রোগ হয়ে দাঁড়িয়েছে যে এইডস আক্রান্ত মানেই নিষিদ্ধপল্লিতে যাতায়াত বা কোন অবৈধ্য কূকর্মের সাথে জড়িত। তাই আক্রান্তরা মুখ ফুটে রোগ প্রকাশ্যে আনতে লজ্জা পান। বাঁচার ইচ্ছা থাকলেও চিকিৎসাহীন ভাবে জীবনযাপন করেন। পরাজয় স্বীকার করে নেন ভাইরাসের কাছে। তাই সমাজের সার্বিক সচেতনতা প্রয়োজন এইডস সম্পর্কে। জানা দরকার যে এইডস শুধুমাত্র নিষিদ্ধপল্লি থেকে ছড়ায় না। আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে অসুরক্ষিত যৌনমিলন করলে, ইঞ্জেক্সানের মাধ্যমে যারা ড্রাগ ব্যবহার করেন, একই সূঁচ বা ব্লেড বহু জনের ব্যবহার করলে রক্তের মাধ্যমে এই ভাইরাস ছড়াতে পারে। তাই আক্রান্ত যে কেউ হতে পারে। তাই সবসময় কূরুচিকত মন্তব্য না করে সবার উচিৎ আক্রান্তের পাশে সাধ্যমত থাকা। আক্রান্ত ব্যক্তিরা যাতে মানসিক ভাবে দূর্বল না হয়ে পড়েন সেই কাউন্সেলিং কিন্তু আমাদেরই করতে হবে। ভারত সরকারের এইডস কন্ট্রোল প্রোগ্রামের মাধ্যমে সম্পূর্ন বিনামূল্যে এইডস এর চিকিৎসা করা হয়। শুধু চিকিৎসা নয় সমস্ত রক্ত পরীক্ষাও বিনামূল্যে করা হয় সরকারি হাসপাতাল গুলোতে। ‘হেলথ ফর অল’ অর্থাৎ সুস্বাস্থ্য সকলের জন্য এই স্লোগান সম্পর্কে সাধারণ মানুষের সচেতন করার জন্য এবং সাধরণ মানুষ এইচ আই ভি ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত কিনা তার জন্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষার মাধ্যমে রোগ সম্পর্কে জেনে যাতে তড়িঘড়ি চিকিৎসা শুরু করা যায় তার জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংখ্যা জোরকদমে প্রচার চালাচ্ছে।

এছাড়াও বিভিন্ন সোসাল মিডিয়া,স্কুল কলেজে এই এইডস প্রতিরোধের জোরকদমে প্রচারাভিযান শুরু হয়েছে।প্রতিরোধ মূলক ব্যবস্থা হিসাবে সুরক্ষিত যৌনমিলন,একই সিরিঞ্জ বহুজনের ক্ষেত্রে ব্যবহার না করা,ইঞ্জেক্সানের মাধ্যমে ড্রাগ না নেওয়া ও একই ব্লেড ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে হবে।বিশেষ নজর দিতে হবে গর্ববতী মায়েদের দিকে। কারন এতে গর্বস্থ্ বাচ্চারও আক্রান্তের সম্ভাবনা প্রবল থাকে।মনে রাখতে হবে এইডস যত তাড়াতাড়ি জানা যাবে ততই ভাল।সঠিক চিকিৎসায় সম্পূর্ন সুস্থ জীবনযাপন করা যায়।
ইতি
মেহেদি হাসান মোল্লা (কল্যানী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল)

Facebook Comments