মিম কী সত্যিই ভোট কাটুয়া! ভোটের পরিসংখ্যা কী বলছে! কলম ধরলেন বিশিষ্ট কলামিস্ট এমডি জিম নাওয়াজ

মিম কী সত্যিই ভোট কাটুয়া! ভোটের পরিসংখ্যা কী বলছে! কলম ধরলেন বিশিষ্ট কলামিস্ট এম ডি জিম নাওয়াজ

বেঙ্গল রিপোর্ট নিউজ ডেস্ক: নিরপেক্ষ রাজনৈতিক বিশ্লেষণ হওয়া উচিত তথ্যভিত্তিক। অন্যভাবে বললে, কোনো ভোট রাজনৈতিক বিশ্লেষণ যদি তথ্যভিত্তিক না হয় অথবা তথ্যের সাথে সাংঘর্ষিক হয়, তাহলে সেই বিশ্লেষণ শুধু পক্ষপাতমূলকই হয় না, একইসাথে চূড়ান্ত বিভ্রান্তিকরও হয়। বিভ্রান্তিকর রাজনৈতিক বিশ্লেষণে যেমন দূরদর্শিতা থাকে না, তেমনি ত্রুটি বিচ্যুতিগুলি শুধরে নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে রাজনৈতিক উত্তরণের কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায় না।

সাম্প্রতিক বিহার নির্বাচনে মহাজোটকে হারিয়ে এনডিএ জয়লাভ করেছে। এই জয়ের জন্য অনেকেই মিমকে দায়ী করতে শুরু করেছেন। তারা বলছেন, মিমের ভোট কাটার ফলেই বিহারে মহাজোট হেরেছে, এনডিএ জয়ী হয়েছে। অর্থাৎ মিম প্রার্থী না দিলে মহাজোট জয়ী হতো। না, এইসব বিশ্লেষকরা তাদের বক্তব্যের সমর্থনে কোনো তথ্যের উল্লেখ করছেন না। তাদের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে আপনি একটিও তথ্য দেখতে পাবেন না।

সত্যিই কী মিমের ভোট কাটার কারণে এনডিএ জয়ী হয়েছে! তথ্য কী বলে? আসুন, দেখে নিইঃ

বিহার নির্বাচনে মিম সর্বমোট প্রার্থী দিয়েছিল ২০টি আসনে। এই ২০টি আসনের মধ্যে মিম নিজে জয়ী হয়ে হয়েছে ৫টি আসনে, স্ট্রাইক রেট- ২৫ শতাংশ। মহাজোট জয়ী হয়েছে ৯টি আসনে, স্ট্রাইক রেট ৪৫ শতাংশ। বিহারের সর্বমোট ২৪৩ আসনের পরিপ্রেক্ষিতেও মহাজোটের স্ট্রাইক রেটও

৪৫ শতাংশ। অন্যদিকে, ২০টি আসনের মধ্যে এনডিএ জয়ী হয়ে ৬টি আসনে, স্ট্রাইক রেট ৩০ শতাংশ। ২৪৩ আসনের পরিপ্রেক্ষিতেও এনডিএ-র স্ট্রাইক রেট ৫১ শতাংশ।

উপরের পরিসংখ্যান থেকে সহজেই বোঝা যাচ্ছে যে, মিম যে আসনগুলিতে প্রার্থী দিয়েছিল সেই আসনগুলিতে এনডিএ তেমন একটা লাভ করতে পারেনি। বরং বিহারের সার্বিক ফলের তুলনায় তাদের ক্ষতিই হয়েছে। অন্যদিকে মহাজোটের তেমন কোনো ক্ষতি হয়নি। এখন প্রশ্ন হতেই পারে, মিমের দেওয়া ২০টি আসনের মধ্যে যে ৬টি আসনে এনডিএ জয়ী হয়েছে তাতে মিমের কতটা দায় রয়েছে? মিম প্রার্থী না দিলে কী এই আসনগুলিতে এনডিএ জয়ী হতে পারতো?

উত্তর পাওয়ার জন্য আসুন নির্দিষ্ট ৬টি আসনের ভোট পরিসংখ্যান একবার দেখে নেওয়া যাক:

১) বারারি বিধানসভা কেন্দ্রঃ এই বিধানসভা আসনে এনডিএ-র জেডিইউ প্রার্থী বিজয় সিং পেয়েছেন ৮১৭৫২টি ভোট পেয়েছেন। মহাজোটের আরজেডি প্রার্থী নীরাজ কুমার ৭১৩১৫ ভোট পেয়েছেন। অর্থাৎ এনডিএ প্রার্থী ১০৪৩৭ ভোটে মহাজোট প্রার্থীকে পরাজিত করেছেন। এই আসনে মিম প্রার্থী রাকেশ কুমার রৌশান পেয়েছেন ৬৫৯৮টি ভোট যা জয়ের ব্যবধানের চেয়ে অনেকটাই কম। সুতরাং, এই আসনটিতে জয়-পরাজয়ের ক্ষেত্রে মিম দলের বিন্দুমাত্র দায় লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।

২) ছাত্তারপুর বিধানসভা কেন্দ্রঃ এই বিধানসভা আসনে এনডিএ-র বিজেপি প্রার্থী নীরাজ কুমার সিং পেয়েছেন ৯৩৭৫৫ ভোট। নিকটতম মহাজোটের আরজেডি প্রার্থী বিপিন কুমার সিং পেয়েছেন ৭৩১২০ ভোট। অর্থাৎ এনডিএ প্রার্থী ২০৬৩৫ ভোটে মহাজোট প্রার্থীকে পরাজিত করেছেন। অন্যদিকে, এই আসনে মিম প্রার্থী আলম পেয়েছেন মাত্র ১৯৯০টি ভোট। প্রাপ্ত ভোটের হিসেবে মিম এই আসনটিতে নবমতম স্থানে রয়েছে। সুতরাং, এই আসনটিতে জয়-পরাজয়ে মিমের দায় একেবারেই নেই।

৩) নরপতগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রঃ এই আসনে এনডিএ-র বিজেপি প্রার্থী জয় প্রকাশ যাদব ৯৮৩৯৭ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। নিকটতম মহাজোটের আরজেডি প্রার্থী অনিল কুমার যাদব পেয়েছেন ৬৯৭৮৭ ভোট। হিসেব করে অনুযায়ী, এনডিএ প্রার্থী ২৮৬১০ ভোটে মহাজোট প্রার্থীকে পরাজিত করেছেন। এই বিধানসভা কেন্দ্রে মিম প্রার্থী হাদিস পেয়েছেন ৫৪৯৫টি ভোট যা জয়ের ব্যবধানের প্রায় ৫ ভাগের এক ভাগ। সুতরাং, পরিসংখ্যান অনুযায়ী এই আসনটিতেও জয়-পরাজয়ের ক্ষেত্রে মিমের বিন্দুমাত্র অংশগ্রহণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।

৪) প্রাণপুর বিধানসভা কেন্দ্রঃ এই বিধানসভা আসনে এনডিএ-র বিজেপি প্রার্থী নিশা সিং পেয়েছেন ৭৯৯৭৪টি ভোট। নিকটতম মহাজোটের কংগ্রেস প্রার্থী তাক্বীর আলম ৭৭০০২ ভোট পেয়ে পরাজিত হয়েছেন। অর্থাৎ এনডিএ প্রার্থী মাত্র ২৯৭২ ভোটের ব্যবধানে জয়ে হয়েছেন। অন্যদিকে, এই আসনে মিম প্রার্থী হাসান মাহমুদ আহমেদ পেয়েছেন মাত্র ৫০৮টি ভোট। প্রাপ্ত ভোটের হিসেবে মিম এই আসনটিতে মিম তেরতম স্থানে রয়েছে যা জয়-পরাজয়ের নিরিখে কোনো ভূমিকা গ্রহণ করেনি।

৫) রানিগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রঃ এই আসনে এনডিএ-র জেডিইউ প্রার্থী অস্মিত ঋষিদেব ৮১৯০১ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। নিকটতম মহাজোটের আরজেডি প্রার্থী অবিনাশ মঙলাম পেয়েছেন ৭৯৫৯৭ ভোট। অর্থাৎ এই আসনে এনডিএ প্রার্থী ২৩০৪ ভোটে মহাজোট প্রার্থীকে পরাজিত করেছেন। এই বিধানসভা কেন্দ্রে মিমের দলিত প্রার্থী রোশান দেবী পেয়েছেন ২৪১২টি ভোট যা জয়ের ব্যবধানের চেয়ে মাত্র ১০৮টি ভোট বেশি। যদিও প্রাপ্ত ভোটের নিরিখে এই আসনে মিম প্রার্থী সপ্তমতম স্থানে রয়েছেন। এমনকি নোটা-তেও মিম প্রার্থীর তুলনায় বেশি ভোট পড়েছে। সুতরাং, পরিসংখ্যান অনুযায়ী এই আসনটিতেও জয়-পরাজয়ের ক্ষেত্রে মিমের কোনো দায় দেখা যাচ্ছে না।

সাহেবগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রঃ এই কেন্দ্রে এনডিএ-র ভিআইপি(বিকাশশীল ইনসান পার্টি) প্রার্থী রাজু কুমার সিং ৮১২০৩ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। নিকটতম মহাজোটের আরজেডি প্রার্থী রামবিচার রায় পেয়েছেন ৬৫৮৭০ ভোট। হিসেব অনুযায়ী এই আসনে এনডিএ প্রার্থী ১৫৩৩৩ ভোটে মহাজোট প্রার্থীকে পরাজিত করেছেন। এই বিধানসভা কেন্দ্রে মিম প্রার্থী মুহাম্মদ মকীম পেয়েছেন ৪০৫৫টি ভোট যা জয়ের ব্যবধানের প্রায় ৪ ভাগের এক ভাগ। সুতরাং, পরিসংখ্যান অনুযায়ী এই আসনটিতেও জয়-পরাজয়ের ক্ষেত্রে মিমের বিন্দুমাত্র অংশগ্রহণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।

উপরের হিসেবনিকেশ এবং পরিসংখ্যান অনুযায়ী একথা পরিস্কার যে, বিহার নির্বাচনে এনডিএ-র জয় এবং মহাজোটের পরাজয়ের নানাবিধ কারণ থাকতে পারে, কিন্তু মিম কোনো কারণ নয়। এরপরেও যারা মিমের দায় প্রচার করছেন, মিমকে ভোট কাটুয়া বলছেন হয় তারা একেবারেই নির্বোধ অথবা উদ্দেশ্যমূলকভাবে প্রোপাগাণ্ডা ছড়াচ্ছেন। এবং এই প্রোপাগাণ্ডা করোনা ছড়ানোর জন্য তবলীগ জামাতের দায়ের প্রোপাগাণ্ডার সাথে যথেষ্টই সামঞ্জস্যপূর্ণ।

একথা আমাদের সকলকে বুঝতে হবে, হিন্দু মেরুকরণ ও তার রাজনীতিকরণ একটি ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া যা দীর্ঘকাল যাবৎ সক্রিয়। এই প্রক্রিয়া রোধ করতে তথাকথিত স্যেকুলার দলগুলি পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। এই ব্যর্থতার কারণেই ভারতের বহু জায়গা যেগুলিতে মিমের কোনো অস্তিত্ব নেই, মিম প্রার্থী দেয় না সেগুলিতে হিন্দুত্ববাদী বিজেপি জয়ী হয়েছে, জয়ী হয়ে চলেছে। কেন্দ্রীয় ক্ষমতা দখল করেছে। একের পর এক রাজ্য জয় করেছে, জয় করে চলেছে। আর নিজেদের ব্যর্থতার দায় চাপা দিতেই তথাকথিত স্যেকুলার দলগুলি ‘মিম দায়ী’ মার্কা অজুহাত বানাচ্ছে মাত্র। প্রকৃত সমস্যা সমাধান করতে হলে অজুহাত নয়, নিজেদের ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে সঠিক মূল্যায়নের মাধ্যমে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তা নাহলে সামনের লড়াই আরও ভয়ানক কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।

Facebook Comments