প্রয়াত কাঁথির আপনজন প্রবীণ জ্যোতির্বিজ্ঞানী অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রয়াত কাঁথির আপনজন প্রবীণ জ্যোতির্বিজ্ঞানী অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

সুব্রত গুহ, বেঙ্গল রিপোর্ট, মেদিনীপুর:
চলে গেলেন বিশিষ্ট জ্যোতির্বিজ্ঞানী অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়। সোমবার দক্ষিণ কলকাতার বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯০বছর।

কাঁথি ও এগরা মহকুমার এমন কোনও বিজ্ঞান ক্লাব খুঁজে পাওয়া যাবে না যাদের অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট জ্যোতির্বিজ্ঞানী ড. অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় আসেননি। সাধারণের মধ্যে বিজ্ঞান সচেতনতা প্রসারের অন্যতম ব্যক্তিত্ব ড. অমলেন্দু্ বন্দোপাধ্যায়।

মহাকাশ বিজ্ঞানের জটিল বিষয়কে সহজভাবে ছাত্রছাত্রী তথা সাধারণের কাছে প্রাঞ্জল বাংলায় ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অনন্য।

বর্তমানে বিশ্বখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী জয়ন্ত বিষ্ণু নারলিকার-এর বাবা অধ্যাপক ভি ভি নারলিকারের ছাত্র ছিলেন অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়। বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফলিত গণিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভের পর একটি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। কেন্দ্রীয় সরকারের আবহাওয়া বিজ্ঞান দপ্তর, অ্যাভিয়েশন রিসার্চ দপ্তরের বিজ্ঞানী হিসেবে কাজ করার পর পূর্ব ভারতে প্রথম পজিশনাল অ্যাস্ট্রনমিক্যাল সেন্টারের ডাইরেক্টর হিসেবে ১৯৮০-১৯৮৮ সাল পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন।

১৯৮৮ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সরকারি কর্মক্ষেত্র থেকে আনুষ্ঠানিক অবসর নেওয়ার পর ১৯৮৯ সালে এমপি বিড়লা তারামণ্ডলে যোগ দেন। অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় ‘ইন্টারন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিয়ন অব প্যারিস’, ‘রয়্যাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটি অব লন্ডন’ এবং ‘ব্রিটিশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন অব লন্ডন’-এর নির্বাচিত সদস্যও ছিলেন। পশ্চিমবঙ্গ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির ফেলো ছিলেন।

১৯৯৫ সালে ভারত সরকারের কাছ থেকে জাতীয় পুরস্কারে সম্মানিত হন। পশ্চিমবঙ্গ সরকার ২০০১ সালে তাঁকে ‘গোপাল চন্দ্র ভট্টাচার্য’ স্মৃতি পুরস্কার দিয়ে সম্মানিত করেন। ওই বছরই বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ডিএসসি ডিগ্রি প্রদান করে। বালিসাই জন বিজ্ঞান কেন্দ্রের উদ্যোগে রামনগর রাও হাইস্কুলে তিনদিনের আবাসিক শিবির, নিমতলা হাইস্কুল এবং দেপাল হাইস্কুলের কর্মশালায় ড. বন্দ্যোপাধ্যায় অংশ নিয়েছেন বলে জানালেন কেন্দ্রের মুখপাত্র নন্দগোপাল পাত্র।

প্রভাত কুমার কলেজ, কাঁথিতে তিন দিনের কর্মশালায়, এগরা ও সি এস- এর বার্ষিক অনুষ্ঠানে তিনি উপস্থিত থেকেছেন। বালিসাই জন বিজ্ঞান কেন্দ্রের সম্পাদক তথা দেপাল বি সি বিদ্যামন্দিরের প্রধান শিক্ষক ননীগোপাল বেরার কথায়- ‘বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করণে ড. বন্দ্যোপাধ্যায়ের অবদান অনস্বীকার্য’। প্রভাত কুমার কলেজের পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক ড. প্রদীপ্ত পঞ্চাধ্যায়ী বলেন, ‘ বিজ্ঞানকে সহজ করে সাধারণ মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য নিরলস পরিশ্রম করেছেন তিনি’। এগরা ও সি এস-এর সম্পাদক তথা বৈতা এম এন হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক কণক কান্তি কর বললেন, ‘ তিনি জানতেন বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করতে হলে পৌঁছে যেতে হবে একেবারে তৃণমূল স্তরে। গোড়ার দিকে টেলিস্কোপ হাতে নিয়ে ছুটে যেতেন গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। পরের দিকে স্লাইড সহযোগে জ্যোতির্বিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলো বোঝাতেন। অক্লান্ত ভাবে এই কাজ করে গিয়েছেন আজীবন’।

নন্দগোপাল পাত্র আরও জানালেন, “জ্যোতিষশাস্ত্রের নামে কুসংস্কার অপবিজ্ঞানের বিরুদ্ধে ড. বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন সতত মুখর। সহজ সরল ভাষায় জ্যোতিষশাস্ত্রের ভ্রান্ত দিকগুলো তিনি তুলে ধরতেন সেমিনার ও কর্মশালায়। বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার প্রয়াসে বই লিখেছেন তিনি ইংরেজি ও বাংলা ভাষায়। তাঁর ২২৫টিরও বেশি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে। জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে ইংরেজি ও বাংলা মিলিয়ে আড়াই হাজারেরও বেশি প্রবন্ধ লিখেছেন।

কলকাতার উৎস মানুষ থেকে প্রকাশিত ‘জ্যোতিষ কী আদৌ বিজ্ঞান’ তার মধ্যে অন্যতম। দূরদর্শন ও বেতারে অসংখ্য জনপ্রিয় অনুষ্ঠানেও তিনি অংশগ্রহণ করেছেন”। ড. বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রয়াণে বিজ্ঞানজগতে যে অপূরণীয় ক্ষতি হল তাতে সন্দেহ নেই।

Facebook Comments