এশিয়ার বৃহত্তম বস্ত্রশিল্পের হাটের দুরাবস্থা, ৮ দফা দাবিতে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের দারস্থ: বঙ্গীয় শ্রমিক সম্মেল

এশিয়ার বৃহত্তম বস্ত্রশিল্পের হাটের দুরাবস্থা, ৮ দফা দাবিতে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের দারস্থ: বঙ্গীয় শ্রমিক সম্মেল

অনির্বান ভট্টাচারজী, বেঙ্গল রিপোর্ট, হাওড়া: লকডাউনের জেরে দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল এশিয়ার বৃহত্তম বস্ত্রশিল্পের কেন্দ্র মঙ্গলা হাট সহ মেটিয়াবুরুজ এবং মূর্শিদাবাদের বেলডাঙা হাট। ফলে এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত হাওড়া, উত্তর-দক্ষিন চব্বিশ পরগণা, হুগলী, মেদিনীপুর সহ পশ্চিমবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকার ১৩ লক্ষ বাঙালি দর্জি সহ ২ কোটির বেশি ছোট ওস্তাগর, জরি ও এমব্রয়ডারি শিল্পী, হোলসেলার, রিটেলারের জীবন জীবিকা আজ প্রশ্নের মুখে।

অন্যান্য বছর চৈত্র সেল, পয়লা বৈশাখ থেকে ঈদ পর্যন্ত এই হাওড়া মেটিয়াবুরুজের হাট থেকে বাংলার দর্জি ভাই বোনেদের বানানো পোষাক ভারতের ৮৫% মধ্যবিত্ত সহ এশিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে যে রেডিমেড জামার ব্যবসার রমরমা বাজার চলতো, এবছর লক ডাউনের জেরে ব্যবসা তো দুরস্ত দুবেলা দুমুঠো খাবারটুকুও কষ্টে জুটছে।

দক্ষিনবঙ্গের হাওড়ার বাকড়া, ধুলাগড়, অঙ্কুরহাটি, ডোমজুড়, হুগলী, দক্ষিন চব্বিশ পরগনার আক্রা, সন্তোষপুর, ক্যানিং, মগরাহাট, ঘুটিয়ারি শরিফ এবং মেদিনীপুরের যে দর্জি ভাই ও বোনেরা সামান্য কিছু পুঁজি সঞ্চয় করে হাটে গদি লিজে নিয়ে ব্যবসা করছিলো লকডাউনে কর্মিদের বেতন দিতে আর নিজের খাদ্যের সংস্থান করতে তাদের শেষ সম্বল টুকুও বেরিয়ে যাচ্ছে।

এই ব্যবসার সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে এই সেক্টর সারা বছর ধরে যেভাবে নিয়মিত রাজ্যের অর্থনৈতিক কাঠামোকে মজবুত করে থাকে তাতে এই শ্রেণী পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তি এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।

একই রকম দুরবস্থার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে বাংলার অসংখ্য তাঁতী ও হোসিয়ারী শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ভাই বোনেরা। নদীয়ার শান্তিপুর ও ফুলিয়া তাঁত কেন্দ্র দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। তাঁতীরা তাদের তাঁত বিক্রি করতে পারেনি, মহাজনরা সঠিক মজুরি দিচ্ছে না। আগামী দিনে কাজ করার পুঁজি, খাদ্য সামগ্রী ও জীবিকার জন্য প্রয়োজনীয় বস্তু কেনায় ব্যয় হয় যাচ্ছে। অন্য দিকে হোসিয়ারী শ্রমিকদের অনেকের মাইনে বন্ধ করে দিয়েছে মালিকেরা।

দর্জি, ওস্তাগর, তাঁতী ও হোসিয়ারী শ্রমিক ভাই-বোনদের স্বার্থ রক্ষার্থে আজ ১০ সেপ্টেম্বর পথে নামলো জাতীয় বাংলা সম্মেলনের অসংগঠিত শ্রমিক সংগঠন বঙ্গীয় শ্রমিক সম্মেলন। পথে সভা হলো হাওড়ার অঙ্কুরহাটি হাটে। বঙ্গীয় শ্রমিক সম্মেলন বস্ত্রশিল্পী ভাই বোনদের স্বার্থে ৮ দফা দাবী রেখেছে রাজ্য সরকারের কাছে।

বঙ্গীয় শ্রমিক সম্মেলনের দাবী:

১. বাংলার অতি প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী এই দর্জি শিল্পকে সরকারি স্বীকৃতি দিতে হবে।

২. দর্জি ও তাঁতী ভাই বোনদের জন্য আর্থিক প্যাকেজ ঘোষণা করতে হবে। মাঝারি ও ছোট ব্যবসায়ীরা তাদের পুঁজি (working capital) থেকেই ৫০ দিন যাবত নিজের এবং শ্রমিকদের খাদ্যের সংস্থান করছে। এই পুঁজির ব্যবস্থা করতে হবে এবং ব্যাংকে টাকা দেওয়ার (direct cash transfer) ব্যবস্থা করতে হবে।

৩.কম সুদে দীর্ঘ মেয়াদী ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে, ঋণ পদ্ধতি সরলীকরণ করতে হবে এবং অন্ততঃ আগামী ১ বছর ঋণ শোধ স্থগিত রাখতে হবে।

৪. হাটে মাঝারি ও ছোট ব্যবসায়ীদের লিজ নেওয়া স্টলের সময় সীমা বাড়ানো বা টাকা মুকুবের ব্যপারে মালিক পক্ষের সাথে সরকারকে মধ্যস্থতা করতে বলছে।

৫. মহাজনদের থেকে তাঁতী ভাই-বোনেরা ঠিক দাম পাচ্ছে না, তাই নূন‍্যতম মজুরি সরকার ঠিক করুক।

৬. লক ডাউনের জন্য হাট বসা বন্ধ হয়ে গেছে। তাঁতীদের থান বিক্রি হচ্ছে না, তাই সরকার তাঁতীদের কাছ থেকে থান কিনে নিক।

৭. রাজ্য সরকার সুনিশ্চিত করুক কোনো হোসিয়ারী শ্রমিকের পাওনা যেন মালিক আটকে না রাখে।

৮. দর্জি, ওস্তাগর, তাঁতী ও হোসিয়ারী শ্রমিকদের জন্য জীবন বীমা ও স্বাস্থ্য বীমার ব্যবস্থা করতে হবে।

আজ পথেসভায় বঙ্গীয় শ্রমিক সম্মেলনের সদস্যবৃন্দ ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন জাতীয় বাংলা সম্মেলনের সাধারণ সম্পাদক সিদ্ধব্রত দাস, সহযোদ্ধা অতনু সিংহ ও রেজাজরু রেহমান মোল্লা। সিদ্ধব্রত দাস বললেন ” কেন্দ্রীয় সরকার কর্পোরেটদের হাজার হাজার কোটি টাকা লোন দেওয়ার সময় কিছু ভাবে না। কিন্তু শ্রমজীবী ভাই বোনদের পাশে দাঁড়ানোর কথা ভুলে যায়। শ্রমজীবী ভাই বোনেরা টাকা নিয়ে বিদেশ পালায় না, সরকারের প্রিয় কর্পোরেটরাই পালায়। তাই অবিলম্বে এই করোনা পরিস্থিতিতে কম সুদে ঋণের ব্যস্থা করুক সরকার”।

আগামী দিনে বঙ্গীয় শ্রমিক সম্মেলন এই সকল দাবী নিয়ে বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে কর্মসূচি নেওয়ার কথা চিন্তা ভাবনা করছে। রাজ্য সরকারের কাছে তাদের দাবী নিয়ে যাওয়ারও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে সংগঠনের তরফ থেকে।

Facebook Comments