কীভাবে ধ্বংসের দিকে এগিয়েছে বাবরি মসজিদ

কীভাবে ধ্বংসের দিকে এগিয়েছে বাবরি মসজিদ

বেঙ্গল রিপোর্ট ডিজিটাল ডেস্ক: ২৮ বছর আগে ভাঙা হয়েছিল বাবরি মসজিদ। বুধবার সেই মামলার রায়। তার আগে একবার দেখে নেওয়া যাক মসজিদ নির্মাণ থেকে ধ্বংসের দীর্ঘ পথটা। মাঝে কেটেছে প্রায় ৫০০ বছর। দিল্লির তখতে তখন বাবর। তাঁর নির্দেশে আওধ দখল করলেন সেনাপতি মীর বাকি। ১৫২৭ সালে। পরের বছর সম্রাটের নামে সরযূ নদীর তীরে তৈরি করলেন তিন গম্বুজওয়ালা এক মসজিদ। ইতিহাসে তা–ই বাবরি মসজিদ।

দাবি, হনুমানগঢ়ির পাশে ওই জমিতেই নাকি জন্মেছিলেন রাম লালা। ওই রাম লালার মন্দির ভেঙে মসজিদ নির্মাণ হয়েছে। ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণের (এএসআই) রিপোর্টে মসজিদের তলায় দশম শতকে তৈরি অ–ইসলামিক স্থাপত্যের কথা বলা হয়েছে। তবে মন্দিরের অস্তিত্ব স্পষ্ট ভাবে স্বীকার করা হয়নি। হিন্দুত্ববাদীদের দাবি, মুঘল আমলে একাধিক বার ওই জমি উদ্ধারের চেষ্টা হয়েছিল। যদিও সেই দাবির সমর্থনে ঐতিহাসিক তথ্যপ্রমাণও মেলেনি। উনবিংশ শতকে ব্রিটিশ নথিতে দেখা গেছে, দুই সম্প্রদায় ওই জমিতে ধর্মাচরণ করতেন। ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহ দমনের পর বিতর্কিত জমিকে দু’টি অংশে ভাগ করা হয়। তার পর তা লোহার বেড়া দিয়ে ঘিরে দেয় ব্রিটিশ সরকার। ভিতরের অংশ মুসলিমদের এবং বাইরের অংশ হিন্দুদের ধর্মাচরণের জন্য বরাদ্দ হয়।

• ১৮৭৭ সালে বিতর্কিত জমির ভিতরে অবস্থিত ‘রাম চবুতরা’–য় হিন্দু ভক্তদের প্রবেশের জন্য তৈরি হয় পৃথক পথ। উত্তর দিকে সীতা কি রসুই পেরিয়ে।

• ১৮৮৫ সালের জানুয়ারিতে অযোধ্যার জমি বিতর্ক আদালতে ওঠে। রামলালার প্রধান পূজারি মহন্ত রঘুবীর দাস মন্দির প্রতিষ্ঠার জন্য ফৈজাবাদ আদালতে আবেদন জানান। সেই আবেদন খারিজ হয়। করেন সাব জজ হরকিষণ পণ্ডিত।

• এর পর জেলা আদালতের যান রঘুবীর। বিচারক এফ ই এ চ্যামিয়ের রায়ে বলেন, ‘হিন্দুদের জমির ওপর মসজিদ গড়া দুর্ভাগ্যজনক। কিন্তু ঘটনাটি ঘটেছে ৩৫৬ বছর আগে। তাই নতুন করে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে হবে।

• পরে আওধের বিচারবিভাগীর কমিশনার ডব্লুই ইয়ংয়ের দ্বারস্থ হয়েছিলেন রঘুবীর। সেখানেও ধাক্কা খান।

• ১৯৩৪ সালে গোহত্যার অভিযোগকে কেন্দ্র করে আওধে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ হয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় মসজিদের কাঠামো। মেরামতির জন্য হিন্দুদের থেকে জরমিনার টাকা নেয় ব্রিটিশ সরকার।

• বিতর্কিত জমি নিয়ে শিয়া–সুন্নি বিবাদ শুরু হয়। ফৈজাবাদ আদালতে ওঠে মামলা। ১৯৪৬ সালে বিচারক বলেন, বাবর ছিলেন সুন্নি। তাই জমি সুন্নিদেরই প্রাপ্য। যদিও মীর বাকি ছিলেন শিয়া।

• ১৯৪৯ সালের ২২ ডিসেম্বরের গভীর রাতে মসজিদের মূল গম্বুজের নীচে রামলালার মূর্তি স্থাপন করা হয়। মন্দিরপন্থীদের দাবি, রামলালা প্রকট হয়েছেন। পরের দিন অভিরাম দাস সহ ৬০ জনের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের হয় ফৈজাবাদ জেলার অযোধ্যা থানায়। দায়ের করেন থানার ইন–চার্জ রামদেও দুবে।

• ১৯৪৯ সালের ২৯ ডিসেম্বর বিতর্কিত কাঠামো সহ জমির রিসিভার নিযুক্ত হন স্থানীয় মিউনিসিপ্যাল বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রিয় দত্ত রাম। দু’সপ্তাহ পরেই বিতর্কিত কাঠামোয় অধিষ্ঠিত রামলালার তরফে মামলা দায়ের হয় ফৈজাবাদ আদালতে। আবেদনকারী গোপাল সিং বিশারদ নিজেকে রামলালার প্রতিনিধি হিসেবে দাবি জমির মালিকানা চান।

• এর পর জমির মামলা চেয়ে একের পর এক মামলা দায়ের হয়।

• ১৯৫৯ সালের ১৭ ডিসেম্বর রামলালার সেবাইত হিসেবে জমির অধিকার চেয়ে ফৈজাবাদ আদালতে মামলা করে নির্মোহী আখড়া।

• ১৯৬১ সালে ১৮ ডিসেম্বর বিতর্কিত কাঠামোকে ‘মসজিদ’ হিসেবে ঘোষণার দাবিতে মামলা দায়ের করে উত্তরপ্রদেশ সুন্নি সেন্ট্রাল ওয়াকফ বোর্ড।

• ১৯৮১ সালের ৩ ডিসেম্বর ভোরে আবারও মন্দিরের দরজা খুলে ঢুকে পুজোর চেষ্টা করেন অভিরাম সহ অনেকে। মুসলিমদের তরফে ফৈজাবাদ আদালতে মামলা দায়ের হয়। মামলা করেন স্থানীয় বাসিন্দা হাসিম আনসারি। বিতর্কিত জমির গেটে তালা ঝোলে।

• ১৯৮৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ফৈজাবাদের জেলা বিচারবিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেট কে এন পাণ্ডে রামলালা দর্শনের জন্য ভক্তদের অনুমতি দিলেন। হিন্দু পুণ্যার্থীদের জন্য খোলা হয় বিতর্কিত জমির প্রবেশপথের তালা।

• ক্ষুব্ধ হয় মুসলিম সমাজ। ১৯৮৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি, দিল্লির জামা মসজিদের ইমাম বুখারি এবং সৈয়দ সাহাবুদ্দিনের নেতৃত্বে গঠিত হয় বাবরি মসজিদ অ্যাকশন কমিটি।

• ১৯৮৯ সালের নভেম্বরে বিতর্কিত এলাকার বাইরে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ শিলান্যাস অনুষ্ঠান করে। সেখান থেকেই রামমন্দির আন্দোলনের নেতা হিসেবে পরিচিত লালকৃষ্ণ আডবানি।

• ১৯৯০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর গুজরাটের সোমনাথ মন্দির থেকে অযোধ্যার উদ্দেশে রথযাত্রার সূচনা করেন আডবানি।

• ৩০ অক্টোবর বিতর্কিত জমিতে করসেবকদের সেবার চেষ্টা রদ করেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মুলায়ম সিং যাদব। পুলিশের গুলিতে মারা যান ১৬ জন করসেবক।

• ১৯৯১ সালে ভোটে জিতে উত্তরপ্রদেশে ক্ষমতা দখল করেন বিজেপি–র কল্যাণ সিং। ৭ অক্টোবর অযোধ্যায় বিতর্কিত ২.৭৭ একর জমি অধিগ্রহণ করে সরকার।

• ১৯৯২ সালের ২৭ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্টে হলফনামা জমা দিয়ে করসেবার অনুমতি চায় কল্যাণ সিংয়ের সরকার।

• ৬ ডিসেম্বর করসেবকরা ভেঙে দেন বাবরি মসজিদ। পুলিশের বিরুদ্ধে নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ ওঠে।

Facebook Comments