নতুন বছরে চাহিদা নগদের, প্রধানমন্ত্রীর ভাষনে নিরাশ বাংলার টিকে থাকার লড়াই

নতুন বছরে চাহিদা নগদের, প্রধানমন্ত্রীর ভাষনে নিরাশ বাংলার টিকে থাকার লড়াই

তন্ময় সিংহ, বেঙ্গল রিপোর্ট, কোলকাতা: বারো মাসের তেরো পার্বন, বাঙালীর। শুরু হয় পয়লা বৈশাখের আমেজে আর হুল্লোড়ে। বাঙালির বছরের শেষ পার্বণ চৈত্র সংক্রান্তির গঙ্গাপ্রাপ্তির পরেও নতুন আশা নিয়ে সকাল বেলায় আপামর ভারতবাসী হয়তো আজ একলা হয়ে বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনে জমায়েত করেছিল টিভির সামনে। না এবার প্রধানমন্ত্রী কোনো টাস্ক দেননি, নতুন কোনো আশ্বাস দেননি, পুরোনো কোনো স্কীম কে নতুন মোড়কে পেশ করেননি, তিনি দেশবাসীকে সাতটি আবেদন রেখেছেন। এরই সাথে আশ্বাস দিয়েছেন লকডাউন ৩রা মে পর্যন্ত চললেও আংশিক শিথিল হবে ২০ ই এপ্রিলের পর থেকে এলাকাভিত্তিক।

অথচ প্রত্যাশার পারদ ছিলো আকাশছোঁয়া, কার্গিলের যুদ্ধের পর প্রধানমন্ত্রীর তহবিল উপছে পড়ছিলো কর্পোরেট ইন্ডিয়া থেকে ক্ষুদ্র ভারতীয় শিল্প সংস্থার, সাধারন ভারতীয় থেকে ইন্ডিয়ার বিলিয়নিয়ারের দানে। চীন থেকে এতোদিন সস্তা ও কমআয়ুর ছুঁচ থেকে উড়োজাহাজ আমদানি করা ভারতেও এসে পৌঁছালো করোনা ভাইরাস। জৈব অস্ত্র না রোগ সেই নির্ণয় চূড়ান্ত হওয়ার আগেই সারা বিশ্ব স্তব্ধ হয়ে গেছে চৈনিক ভাইরাসের আক্রমনে। প্রায় কুড়ি লক্ষ লোককে আক্রান্ত করে, এক লক্ষ কুড়ি হাজার মৃত্যু নিয়ে প্রায় ২১০টি দেশে বিশ্বজুড়ে তান্ডব চালাচ্ছে চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরে জন্ম নেওয়া ভাইরাস। ভারতেও দশ হাজারের বেশি মানুষ আক্রান্ত ও প্রায় ২৫০ জন মৃত ইতিমধ্যে। দেশ মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে লকডাউন আতঙ্কের মধ্যে তিন সপ্তাহ স্তব্ধ। দেশ ও রাজ্য তাদের সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে এই ১৩০ কোটির দেশ ভারতে লড়াই করছে করোনা প্রতিরোধের। রেশন ব্যাবস্থা হয়েছে অভিনন্দন যোগ্য, যদিও একটা অংশের মানুষ বিশেষত পরিযায়ী শ্রমিকরা বঞ্চিত ও আটকে আছে এখনও।

এমতাবস্থায় তৃতীয় বারের জন্য বাংলা নববর্ষের পুণ্য তিথিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী লাইভে আসতেই দেশ জুড়ে মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত ও দৈনিক রেজগারের মধ্যে দিয়ে জীবন ও জীবিকা নির্বাহ করা মানুষের চাহিদা ছিলো নগদ অর্থের। জন ধন অ্যাকাউন্টে মহিলাদের ৫০০ টাকা করে প্রতিমাসে ও উজালা যোজনায় তিন মাস বিনামূল্যে গ্যাস দেওয়ার পর পরে মানুষের চাহিদা ছিলো বাজার করার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের। এই লকডাউন পিরিয়ডে কাজ হারানো, রোজগার হারানো সাধারণ মানুষের কাছে টাকা পৌঁছে দেওয়ার জন্য ব্যবহার করা যেত বিগত সরকারের আমলে গঠিত একশ দিনের কাজের প্রকল্প। দেশের বেশিরভাগ পরিবারের অ্যাকাউন্ট মনরেগা প্রকল্পে থাকায় তাদের কাছে অতি সহজেই পরিবার পিছু মাসিক সাহায্য পৌঁছে দেওয়া যেত। সাধারন মানুষের হাতে ক্রয়ক্ষমতা থাকলে বাজারে আবার আনাগোনা হবে খদ্দেরের অর্থনীতির গোড়ার কথা অনুযায়ী লেনদেন বাড়লেই স্বাস্থ্য ফিরবে। ক্রয়ক্ষমতা না থাকলে প্যানিক বাটন আরও বিস্তার লাভ করবে, দেশে সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকা দুর্বিষহ হয়ে উঠবে। কাজ হারানো শ্রেনি বিকল্প রোজগার না পেলে ভাতের সাথে আলু সেদ্ধ র সংস্থান করতেই বিপথগামী হবে। এই ভারতের সাধারণ মানুষের কথা ভেবে শুধু পাঁচশ টাকা করে তিন মাস নয় অন্তত পাঁচহাজার টাকা করে ছয়মাসের অর্থনৈতিক প্যাকেজ প্রতি পরিবার পিছু ঘোষণা করা উচিত সরকারের।

পশ্চিমবঙ্গ সরকারও তার সীমিত আর্থিক সামর্থ্যের মধ্যে রেশন ব্যবস্থা চালু করেছে, প্রত্যেক জেলাতে একাধিক করোনা হাসপাতালের প্রস্তাব নিয়ে পরিকাঠামো তৈরী হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি লড়াইয়ের জন্য। রাজ্যের সমস্ত মানুষকে কিভাবে স্বাস্থ্য বিধি অনুসরণ করেও লকডাউন পিরিয়ডে নগদ অর্থের যোগান দেওয়া যায়, তার জন্য কিছু ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থা করেছেন। মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী হটস্পট ঘোষনার পাশাপাশি একটি গ্লোবাল অ্যাডভাইজারি টীমের ঘোষণা করেছেন কি করে রাজ্যবাসীকে করোনা পরবর্তীতে স্বাচ্ছন্দ্য দেওয়া হয়। তবুও নগদ অর্থের যোগান, পরিকাঠামো র অভাব, পিপিঈ এর অভাব আবার কখনও খবর চেপে দেওয়ার অভিযোগে নাজেহাল রাজ্য। সাধারণ মানুষের আশা তবু বাংলা নববর্ষের প্রাক্কালে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী নগদ অর্থের যোগান দেওয়ার জন্য কিছু স্কীম ঘোষণা করবেন সমাজের প্রান্তিক মানুষের পাশাপাশি কাউকে মুখ না ফুটে চাইতে পারা কাজ হারানো,রোজগার হারানো মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য।

কেন্দ্রীয় সরকার অবশ্যই সমস্ত উন্নয়নের বরাদ্দ স্তব্ধ করে প্রথমেই করোনা ভাইরাসের আতঙ্ক মোকাবিলায় চাপ দিয়ে দিয়েছে প্যানিক বাটনে। মানুষ বুঝছে ঘরবন্দী অবস্থায় তারা থাকতে থাকতেই দেখবে দেশের অগ্রগতি ও ঘরবন্দী হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ না বাড়িয়ে, দেশের প্রত্যেক মানুষের জন্য আয়ুস্মান ভারত বীমা নিশ্চিত না করলেও ভারত স্বপ্ন বিক্রি করেছে পৃথিবীর বড় অর্থনীতি হওয়ার। সামান্য নাড়া খেতেই সেই স্বপ্নের রাজপ্রাসাদে র আস্তরণ ভেঙ্গে কঙ্কালসার অর্থনীতির চেহারা বেরিয়ে পড়েছে, সাধারণ মানুষ যাতে এই ২০২০ তে খাদ্যাভাবে না মারা যায় সেটা সুনিশ্চিত করে এই ১৩০ কোটি মানুষের বাজারে রক্তসঞ্চালনা করতে পারাই এ সরকারের বড় পরীক্ষা, আর তার জন্য প্রয়োজন হাতে নগদ অর্থের যোগান।

Facebook Comments