পশ্চিমবাংলায় বাম – কংগ্রেস জোট! কংগ্রেসকে ডোবাবে সিপিএম!

ফাইল চিত্র

পশ্চিমবাংলায় বাম – কংগ্রেস জোট! কংগ্রেসকে ডোবাবে সিপিএম!

পাঠকের কলমে, বেঙ্গল রিপোর্ট:
বাংলা এমনকি ভারত থেকে বামফ্রন্ট তথা সিপিএম নিশ্চিহ্ন প্রায়। কেরল না থাকলে অবশ্যই সিপিএম দেশ শূন্য। মাটি কামড়ে পড়ে থাকে কম্যুনিষ্ট আন্দোলন কি তাহলে ভারত থেকে শেষ হতে চলেছে? এমনটাই অভিজ্ঞ মহলের ধারণা। একটা সময় ছিল গোটা ভারতবর্ষে ছড়িয়ে ছিটিয়ে অনেকগুলো রাজ্যের আইনসডায় বামপন্থীদের উল্লেখযোগ্য প্রতিনিধি ছিল। এরমধ্যে তিনটি রাজ্যের শাসন ক্ষমতা তাদের করায়ত্ব ছিল। এখন মাত্র একটি রাজ্য তাদের হাতে। বাংলা ও ত্রিপুরা থেকে বামপন্থীদের ক্ষমতা চলেগেছে। বাংলার ক্ষমতা হারিয়েছে দশ বছর, সেই হিসেবে ত্রিপুরায় সদ্য। ভবিষ্যতে অর্থাৎ পরবর্তীতে সেখানে ফিরবে কি না তা বলতে পারবোনা। তবে বাংলাতে আর তাদের ফেরার সম্ভাবনা শেষ করে দিয়েছে তারা নিজেরাই ।
২০১১ তে তাদের দীর্ঘ শাসনের অবসান হতেই বাংলার জনগণকে উচিত শিক্ষা দিতে বিজেপি আনার চেষ্টায় তলে তলে নিচুতলায় সেই নির্দেশ পাঠায় এমনই এক জনশ্রুতি গোপনে প্রচলন রয়েছে । এমন পরিকল্পনা কেন? বাংলায় বিজেপি এলে ৩০ শতাংশ সংখ্যালঘু ভোট বামেদের দিকে ঘুরে আসবে। আর বামেদের পকেট ভোট তো আছেই। সুতরাং বিজেপির পরেই বাংলায় বামপন্থীদের কামব্যাক অবস্বম্ভাবী। তাই আপাতত নিচুতলার কর্মী সমর্থকদের বিজেপির কাছে পাঠিয়ে দাও। পরে ঠিক ফিরে আনা হবে।

বামপন্থীরা টানা ৩৪বছর বাংলা শাসন করে এই সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্কের উপর ভর করে। তৃণমূল ২০১১ সালে বামফ্রন্ট সরকারকে ক্ষমতাচ্যুতও করে এই সংখ্যালঘু ভোটের উপরে ভর করে। যেটা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অকপটে স্বীকার করতে দ্বীধাও করেননি। দীর্ঘদিন ক্ষমতার অলিন্দে থাকা দল তথা মানুষ হঠাৎ ক্ষমতা হারিয়ে রাজপথের ভৃত্যে পরিণত হয়ে পড়লে যেমন দিকভ্রান্ত হয়ে পড়ে, ঠিক তেমনই অবস্থা বঙ্গ বামপন্থীদের হয়।
বামপন্থীদের ক্ষমতার স্বাদ থেকে দুরে থাকার সিমা যত দীর্ঘ হচ্ছে। ক্ষমতা ফিরে পেতে উন্মাদতা ততই প্রকট হচ্ছে। উন্মাদতার মধ্যে স্বপ্নও দেখছে ক্ষমতা ফিরে এসেগেল বলে। কিন্তু আর তা আসবেনা তাদের হাতে। বাংলায় যারা বামপন্থীদের কাম ব্যাকের আশা করছেন, তারা এই আশা ত্যাগ করুন। আর যেসব ছোটখাটো বামপন্থী নেতারা(যদিও বর্তমানে তারা আর নেতা নয়, ছুপা নেতা) আবার ক্ষমতা ফিরে পাবার আশা করছে যারা তাদের সে আশা দুরাশা।

বঙ্গের বর্তমান বামপন্থীরা মনেপ্রাণে বামপন্থী নন, তাই আর আপনাদের কামব্যাক হবেনা। মনেপ্রাণে বামপন্থী নন কেন বললাম, তার ব্যাখ্যা দেওয়া দরকার। বাংলা থেকে ক্ষমতা হারাবার পরে আবার ক্ষমা ফিরে পেতে তারা তলে তলে বিজেপির সহযোগি হিসেবে কাজ করেছেন। আশায় ছিলেন সাম্প্রদায়িক শক্তিকে এনে বাংলায় অশান্তি করিয়া দিলেই মানুষ আবার বামপন্থায় ভরসা করবে। এটা করতে গিয়ে যারা প্রকৃত বামপন্থী তথা সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী তারা বঙ্গের নকল বামপন্থীদের ছেড়ে হয় অন্য দল করেছে কিম্বা কোন ডানপন্থী দলে নাম লিখিয়েছেন অথবা সরাসরি শাসক দলে চলেগেছেন। এমন বামপন্থীদের নাম উল্লেখ করার দরকার নেই। সকলেই তা দেখছেন বা বুঝছেন। যদিও বঙ্গের মেকি বামপন্থীরা ওই দলত্যাগীদের ‘গদ্দার’ বলতে ভালোবাসেন। কিন্তু জনগণের বিবেচনায় তারাই প্রকৃত ঈমানদার। হালের বামপন্থীরা এখন দেখুন বা বুঝুন আপনাদের ‘বাম’ থেকে ‘রাম’ প্রীতির পরিণতি কি। কেন তারা তখন রামে না গিয়ে ডানে অর্থাৎ কংগ্রেসের দিকে গেলে না? কারণের গভীরে রয়েছে ওনাদের উপর উপরে বাম (কম্যুনিস্ট) ও ভিতরে রাম(সাম্প্রদায়িকতা) প্রীতি। এই সুযোগে অনেকেই তলে তলে না থেকে সরাসরি রামেই ভিড়ে গিয়ে ক্ষমতার স্বাদ ভোগ করছেন।

বামপন্থীদের বুঝতে হবে যে উপরে কম্যুনিস্ট আর ভিতরে জাতি বিদ্বেষ দু’রকম নীতি নিয়ে সাফল্য পাওয়া যায় না। মানুষ তা ধেরে ফেলে। ২০১১ তে ক্ষমতা হারিয়ে ২০১৪তে বামপন্থীরা কি করেছিল তার অনেকটাই বুঝে ফেলেছিল। তাই ২০১৬ তে যখন কংগ্রেসের দিকে ঝুঁকলো তখন বাংলার মানুষ ওদের ভিতরের রাম প্রীতির বিষয়টা ধরে ফেলেছে। তাই কংগ্রেসের সাথে জোট করেও প্রধান বিরোধী দলের মর্যাদায় বাংলার মানুষ তুলে আনেনি অথচ আসা উচিত ছিল।বরং বাংলার মানুষ বিকল্প হিসেবে কংগ্রেসের প্রতিই ভরসা রাখলো। অফিসিয়াল বিরোধী দল হল কংগ্রেস।

২০১৯ সালে আবার বামেদের সেই রামভক্তি প্রকট হল। বিজেপির সুবিধে করে দিতে ইচ্ছাকৃত ভাবেই কংগ্রেসের সাথে জোট করা থেকে বিরত থাকল। রায়গঞ্জ নিয়ে জট পাকিয়ে জোট ভেস্তে দিল। জোট ভেস্তে যাওয়ার পরেও কিন্তু কংগ্রেস কয়েকটি আসনে প্রার্থী না দিয়ে রাজ্য ও কেন্দ্রের শাসক দলের সুতরাং সিপিএম তথা কম্যুনিস্টদের সৌজন্য দেখায়। অথচ বামেরা তেমন পাল্টা সৌজন্য খায়নি।যাদবপুর কেন্দ্রের বাম প্রার্থী বিকাশ রঞ্জন চ্যাটার্জীর জেতার সম্ভাবনা ছিল এমন সম্ভাবনা ফল প্রকাশের আগে পর্যন্ত কেউ উড়িয়ে দিতে পারেনি। সেই সম্ভাবনা উপলব্ধি করে কংগ্রেস বিকাশের বিরুদ্ধে প্রার্থী দেয়নি।কংগ্রেসের এই প্রার্থী না দেওয়া টার উদ্দেশ্য হচ্ছে বিকাশবাবু কংগ্রেস ভোট পাক। এমনকি প্রকাশ্যে ঘোষণাও করে যেখানে আমাদের প্রার্থী নেই সেখানে ভোট বামেদের দিন। ২০১৯ লোকসভার ফলে যা হলে তা তো পরিস্কার। বামেদের ১৮ টা আসন পাওয়াতে গিয়ে নিজের ২৩শতাংশ ভোট কমিয়ে ৭ এ নামিয়ে আনতে দ্বিধা করেনি। তাতে নিজের আসন শূন্য হলেও হোক। স্বামী মরে মরুক শতিন তো বিধবা হয়েছে। সুতরাং ২০১৬ পর আবার সেই বাংলার মানুষ শতাব্দী প্রাচীন দল কংগ্রেসের ওপর ভরসা করেছে। পরপর দুটো নির্বাচনে বাংলার মানুষ বামেদের তলানীতে তলিয়ে দিতে চাইলেও ২০২১ বাংলার ক্ষমতায় ফিরে আসার স্বপ্ন দেখছে। স্বপ্ন বাস্তবায়নে কংগ্রেসের সাথে জোট প্রায় পাকা করেছে। কিন্তু কংগ্রেসকে বোঝা উচিৎ, বঙ্গ কম্যুনিস্টদের স্বুপ্ত বাসনা কি? সেই সাথে কংগ্রেসের মধ্যের কিছু দু নৌকায় পা দিয়ে চলা নেতার গতিবিধিতে নজর রাখা উচিত। কংগ্রেসের বোঝা উচিত যে, বাম পরিষদীয় নেতা সুজন চক্রবর্তীর বিজেপির সাথে কোন গোপন বোঝাপাড়া নেই তো! কারণ তিনি যে টোনে কথা বলছেন তার টোনটা কিন্তু দিলিপ ঘোষের টোনের সাথে একদম মিলে যাচ্ছে। দিলিপ ঘোষরা যেমন ঘন ঘন মিটিং করছেন রাজ্যপালের সাথে। তেমনই সুজনবাবু এক কংগ্রেস নেতাকে নিয়ে ঘনঘন রাজভবে যাওয়া একটা সময় পর্যন্ত রুটিনে পরিণত করেছিলেন। অভিযোগ আছে যে, সুজনবাবুরা রাজভবনে গিয়ে রাজ্যের নাম পরিবর্তনের দ্বিতীয় বিলটি স্বাক্ষর না করার অনুরোধ করেছেন। আরো অভিযোগ মোদি ও দিদির বিরুদ্ধে একই অভিযোগ থাকলেও কেবল দিদির বিরুদ্ধে হৈচৈ কেন? সুজনবাবু ছাড়াও দলের উপর সারির কিছু নেতার হাবভাব যথেষ্ট সন্দেহজনক।

গত লোকসভা নির্বাচনে সুজনবাবুর বিরুদ্ধে ভোট বিজেপির বিক্সে তুলে দেওয়ার অভিযোগ করছে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞগণ। তাদের কাছে একটা ছোট্ট দৃষ্টান্ত- যাদবপুর লোকসভার ফলাফল। এই কেন্দ্রে সিপিএম যেখানে এক হওয়ার কথা সেখানে তিন হল। এই লোকসভার ৭টা বিধানসভার মধ্যে যাদবপুর বিধানসভার বিধায়ক সিপিএম এর সুজনবাবু।টালিগঞ্জে মাত্র পাঁচ থেকে সাতশ ভোটে জিতেছিল তৃণমূল। এই লোকসভায় বিধানসভা ভিত্তিক ফলে ভাঙড় ছাড়া কোনো বিধানসভাতে সিপিএম ২নম্বর হতে পারেনি সবগুলোতেই তৃতীয়। ২০১৬ র নির্যাতনে যাদবপুর বিধানসভার সুজনের ভোটাদাতারা কোথায় গেল? নিশ্চয়ই উনি রামের ঘরে পাঠিয়েছেন। টালিগঞ্জেই বা কি হল? সাতটা বিধানসভার ৬টাথে বামেরা দ্বিতীয় আর একটাতে প্রথম। সেই ফল ১৯ এ গড়ে তৃতীয়? তাও তো এই কেন্দ্রে কংগ্রেস প্রার্থী দেয়নি!
তাহলে ভাবুন ২০১১থেকে ঘোকলা বাম নেতারা তাৎক্ষণিক রামের উত্থান চাওয়াটা তাৎক্ষণিক নয়, স্থায়ী। এহেন বাম নেতাদের হাতে হাত ধরে কংগ্রেস নিজের উত্থানের স্বপ্ন দেখলে বঙ্গোপসাগরে নিশ্চিত সলীল সমাধীর অপেক্ষা করুন।

লেখক- প্রাবন্ধিক ও শিক্ষক,
আব্দুল মোমেন, ভাঙড়, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা

Facebook Comments