জঙ্গি প্রমাণে দীর্ঘ প্রক্রিয়া: বারে বারে অবিচারের শিকার হচ্ছেন দেশের সংখ্যালঘু ও দুর্বল সম্প্রদায়ের মানুষ: আব্দুল মোমেন

জঙ্গি প্রমাণে দীর্ঘ প্রক্রিয়া: বারে বারে অবিচারের শিকার হচ্ছেন দেশের সংখ্যালঘু ও দুর্বল সম্প্রদায়ের মানুষ: আব্দুল মোমেন

পাঠকের কলমে, বেঙ্গল রিপোর্ট: এই মুহূর্তে রাজ্যসহ গোটা দেশ তোলপাড়। বাংলায় আলকায়দা জঙ্গিদের আস্তানা। বাংলাটা অনেক আগেই পাকিস্তান হয়েগেছে সেটা এবার প্রমান হয়ে গেল। না! এসব মনগড়া কথা বলে কাজ নেই। ১৯ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা এনআইএ কেরলের এরনাকুলাম ও বাংলার মুর্শিদাবাদে একই সঙ্গে একই সময়ে অভিযান চালিয়ে ৯জন কুখ্যাত জঙ্গিদের পাকড়াও করেছে। ধৃত জঙ্গিদের কাছ থেকে ভয়ঙ্কর নাশকতামূল অস্ত্রশস্ত্র উদ্ধার হয়েছে। উদ্ধারকৃত সরঞ্জামের বিস্তারিত তথ্যাদি বিভিন্ন মিডিয়াতে সবাই দেখেছে। এই জঙ্গি ও তাদের নাশকতামূল কাজকর্ম নিয়ে সোসাল মিডিয়াতে বিভিন্ন ধরনের দাবি উঠছে। আমার চোখে যেসব পোষ্ট পড়েছে তার অধিকাংশই এনআইএকে পরোক্ষে কটাক্ষ করা পোষ্ট। আবার ভিন্নও আছে।

তবে বেশি বেশি দাবি উঠেছে ধৃত জঙ্গিদের দ্রুত বিচার প্রক্রিয়াতে এনে প্রমাণ সাপেক্ষ শাস্তির ব্যবস্থা হোক। এধরনের পোষ্টগুলে দেখে অনেক পুরানো কিছু হতভাগ্য জঙ্গিদের পরিণতির কথা মনে পড়ে গেল।যেগুলো থেকে এমনই অভিজ্ঞতা হয়েছে জঙ্গি কিম্বা জঙ্গি যোগ অথবা নাশকতায় জড়িত সন্দেহে তদন্ত সংস্থা গ্রেফতার করেছে শত শত আরবি, উর্দু অথবা ফারসি নামধারীদের। পাঁচ থেকে পঁচিশ এমনকি চল্লিশ বছর পর্যন্ত জেলের মধ্যে জীবনের মূল্যবান সময় অতিবাহিত করার পরে বেকসুর খালাস পেয়েছে। এমন হাজার খানেক নজীরের মধ্যে সামান্য কয়েকটা দৃষ্টান্ত এখানে উল্লেখ করছি।

বেঙ্গালুরুর এক নামজাদা ইসলাম প্রচারক মাওলানা আনজার শাহ কাশেমিকে দিল্লি পুলিশ আলকায়দা জঙ্গি গোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে গ্রেফতার করে ২০০৬ জানুয়ারি মাসে । দীর্ঘ ১১বছর পর ১৭ অক্টোবর ২০১৭ তে দিল্লির পাতিয়ালা হাউসকোর্ট তাকে বেকসুর ঘোষণা করে মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দেয়। এনআইএ আদালতের বিশেষ বিচারপতি সিদ্ধার্থ শর্মা কাশেমিকে মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দিতে গিয়ে বলেন, কাশেমির বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে গোয়েন্দা সংস্থা।

মুম্বইয়ে দ্বীন মুহাম্মাদকে সিমির সদস্য বলে। তার স্বীকারোক্তি নেওয়ার জন্যে চলে অবর্ণনীয় অত্যাচার। ফার্স্ট, সেকেণ্ড, থার্ড সব ডিগ্রিই প্রয়োগ করা হয়। পুলিশের অত্যাচারে চোখের দৃষ্টি শক্তি লোপ পায়। জেলের অন্যান্য আসামিদের মারে হাত ও পা ভেঙে যায়। দশ বছর বিচার চলার পর আদালত তাকে বেকসুর ঘোষণা করে মুক্তির নির্দেশ দেয়। দ্বীন মুহাম্মাদ যখন গ্রেফতার হয় তখন তার দু’বছরের ছেলে এবং ৬মাসের মেয়ে ছিল। এই শিশুরা তাদের শৈশবের পিতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত হল। নিজের জীবনের মূল্যবান দশ দশটা বছর হারালো, জীবনের মূল্যবান অঙ্গ চোখের দৃষ্টি হারালো, আরো হারালো তার হাত পায়ের স্বাভাবিক ক্ষমতা।

হায়দরাবাদ বিস্ফোরণ মামলায় সন্দেহের ভিত্তিতে গ্রেফতার হয় ওয়েল্ডিং কারখানার কর্মচারী মুহাম্মাদ কলিম। ২৩বছরের কলিমের তখন বিয়ে হয়েছে মাত্র দু’মাস। কলিমকে বাংলাদেশের এক সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠির সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার করার পর ১২বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেলেও কোন অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেনি। অথচ মামলার গতিপ্রকৃতি এমন ছিল যে কলিম মনে করেছিল যে, সে মুক্তি পাবেনা। তাই স্ত্রীকে দ্বিতীয় বিয়ে করে নিতে বলে। সুতরাং জীবনের মূল্যবান ১২ টা বছর হারিয়ে এবং স্ত্রীসহ ভাড়ার বাড়ি হারিয়ে শেষে বেকসুর হিসেবে মুক্তি পেল।

২৮ বছরের গুলজার আহমেদ ওয়ানি ছিলেন আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক। ২০০০ সালের সবরমতী এক্সপ্রেসে বিস্ফোরণ মামলায় তাকে গ্রেফতার করে। দীর্ঘ ১৬ বছর জেলে কাটানোর পরেও আদালতের কাছে তাকে দোষী প্রমাণিত করতে পারেনি। তাই তাকে বেকসুর ঘোষণা করে। একজন গবেষক ছাত্রের বেকসুর হতে সময় গেল ১৬ বছর। তার মূল্যবান সময় কেটে গেল জেলের মধ্যে।

মুহাম্মাদ জাহিদ (মাদ্রাসা শিক্ষক), রইস আহমেদ ( ইমিটেশন দোকানদার) আবার আহমেদ (ছোট্ট পল্ট্রিফার্ম) নুরুল হুদা (সদ্য বিবাহিত) সকলেই মালেগাঁও বিস্ফোরণ মামলায় গ্রেফতার করা হয়। বল প্রয়োগের মাধ্যমে স্বীকারোক্তি করাতে সমস্ত ডিগ্রি প্রয়োগ করা হয়। রইস আহমেদ যখন গ্রেফতার হয় তখন তার স্ত্রী গর্ভবতী ছিল। সকলেই আদালতের নির্দেশ বেকসুর হিসেবে মুক্তি পায়। তবে জীবনে ১০টা বছর জেলের মধ্যে কাটানোর পর।

ডাক্তার তানভীর, এহসান সিদ্দিকি, ইরশাদ খান, মহসিন মির্জা, রাহিল সেখ, আফতাব আহমেদ, মুজাম্মিল, আহমেদ, সকলেই মুম্বাই লোকাল সিরিয়াল বিস্ফোরণের অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছিল। ২০০১ এর ২৭ সেপ্টেম্বর গ্রেফতার হওয়ার পর ২০০৩ জামিন পেলেও নির্দেশ প্রমান করতে ১৪ বছর লাগে। জামিন পেয়েও নির্দোষ প্রমান করার দায়িত্ব ভুক্তভোগীদের। অভিযোগকারীদের দায়িত্ব নেই অভিযোগ প্রমান করা!

দেশদ্রোহীতা, বিপুল পরিমাণে বিস্ফোরক তৈরি ও মজুতের অভিযোগে গ্রেফতার ১৭ জন যুবক, ২০০৮ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি। ধৃতদের নাম-রাজিউদ্দিন নাসির (৩০) আবু বকর হাফিজ (৩৪), সাকিল আহমেদ মালি (৩৬), সাবিত শিবলি (৩৭), ইয়াহিয়া কাম্মাকুট্টি (৩৯), সফদার হুসেন নাগরি(৪৫), সাদিক সামির(৪০), আকবর আলি মোল্লা (৩৫), কামরুদ্দিন নাগরি(৪১), মুহাম্মাদ ইয়াসিন(৩৩), মুহাম্মাদ আসগার(৩৩),পি এ শাধলী (৩০) মুহাম্মাদ আসিফ(৩০), ডাক্তার আল্লাবক্সি ইয়াদওয়ার(৩০), মির্জা আহমেদ রেজা (৩১), আশাদুল্লাহ আখতার (৩০), মনরোজ জামান (৩৯)। উল্লেখিত সকলকে কর্ণাটক হুবলীর অতিরিক্ত নগর ও জেলা দায়রা আদালত বেকসুর ঘোষণা করে। এই বেকসুর ঘোষণা ৭বজর জেলের মধ্যে অতিবাহিত করার পরে।

মুহাম্মাদ ইয়াকুব হরকাত উল জিহাদ আল ইসলামি (হুজি) জঙ্গি সন্দেহে গ্রেফতার করে ২০০৭ সালের ১০ জুন গ্রেফতার করে। দীর্ঘ আট বজর জেলের ঘানি টানার পর কুরলার মেট্রোপলিটান ম্যাজিস্ট্রেট তাকে নির্দোষ ঘোষণা করে মুক্তির নির্দেশ দেন।

হায়দ্রাবাদ বেগমপেট মানববোমা মামলায় ১০ জন আরবি নামধারীকে গ্রেফতার করে। কিন্তু দশ বছর বিনা বিচারে জেল বন্দি রাখার পর তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের কোন প্রমান দিতে পারেনি।

সম্প্রতি একটা বেসরকারি বৈদ্যুতিন মাধ্যমে সম্প্রচারিত করে প্রশ্নও তুলেছে এবং জনগণের মতামতও নিয়েছে। সম্প্রতি বলে বলছি – মুর্শিদাবাদ থেকে ছয় জঙ্গি গ্রেফতার হওয়ার ঠিক পরের দিন। যে তথ্য সম্প্রচার ও প্রশ্ন তুলেছে তার কোড আন কোড উল্লেখ করছি। “গত তিন চার বছরে এমন বেশ কিছু ঘটনা আমাদের নজরে এসেছে যেখানে বছরের পর বছর বিচারাধীন থাকার পর জানা যাচ্ছে যে আসলেই সেই ব্যক্তি নির্দোষ। আমাদের নজরের আছে মহারাষ্ট্র পুলিশের হাতে গ্রেফতার হওয়া তিন ডাক্তার দু’জন ইঞ্জিনিয়ারসহ সেই ১১জনের বিষয় যাদের জঙ্গি সন্দেহে ১৯৯৪ সালে গ্রেফতার করা হয়েছিল। তারা মুক্তি পেয়েছেন ২০১৯ সালে এবং আদালত ওনাদেরকে নির্দোষ বলেছে। মাঝখানে কেটে গেছে একটা নয় দুটো নয় ২৫টা বছর। খবরটা প্রকাশিত হয়েছিল দ্যা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায়। এই ১১জন প্রত্যেকেই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ। তো এই ধরনের ঘটনা কেন ঘটছে?”

এখানে দর্শকদের যেসব মতামত এসেছে তাও বিশেষভাবে উল্লেখ করার যোগ্য। মন্তব্য এসেছে
দোষী প্রমাণিত না হওয়ার আগে পর্যন্ত কোন বিচারাধীন আসামী কেন জেলে থাকবেন?
কেনই বা সন্দেহভাজনকে প্রমানের আগেই কেন দোষী নয় অথচ কেন দীর্ঘদিন জেলে থাকবেন?
কোন বিচারাধীন বন্দি জেলে কাটানোর পর যদি নির্দোষ প্রমানিত হয় তাহলে তার যে দীর্ঘদিন কেটে গেল তার জীবন কেটে গেল সেই সেই ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের ক্ষতি পূরণের ব্যবস্থা থাকলে তবেই বিচার সঠিক ভাবে।

মন্তব্যগুলো করেছেন কলকাতা টিভির আপনার কথা অনুষ্ঠানে সনৎ দাস।
ওই অনুষ্ঠানের শেষের দিকে সঞ্চালক আরো একটা তথ্য সংযোজন করেন যে দ্য হিন্দু পত্রিকা একটা প্রতিবেদনে প্রকাশ করে।

মুহাম্মাদ আমির খান নামের আর এক যুবকে জঙ্গি সন্দেহে ১৯৯৮ সালে গ্রেফতার করার ১৪ বছর পর নির্দোষ প্রমানিত হয়। এক্ষেত্রে দিল্লি পুলিশ ৫লাখ টাকা দিয়ে দায় সেরেছে।
এবার একটা দৃষ্টান্ত উল্লেখ করছি যেটা থেকে চমকে যাওয়ার মত কিছু আছে। নির্দোষ হিসেবে মুক্তি পাওয়ার পরে নিজের জেল জীবনের কাহিনী নিয়ে বই পর্যন্ত প্রকাশ করতে দেওয়া হয়নি।

২০০৩ গুজরাতের আহমেদাবাদ অক্ষরধাম মন্দিরে বিস্ফোরণ মামলায় গ্রেফতার করা হয় মুফতি আব্দুল কাইউমকে। পুলিশ হেফাজতে ও জেলে তাঁর উপর অকথ্য অত্যাচার করা হয় স্বীকারোক্তি বার করতে। দীর্ঘ ১১বছর জেলে থাকার পর নির্দোষ হিসেবে মুক্তি পান মুফতি সাহেব। মুক্তি পাওয়ার পর ওই মাদ্রাসা শিক্ষক মুফতি আব্দুল কাইউম পরিকল্পনা করেন তাঁর জেল জীবনের গল্প মানুষকে জানাবেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি একটা বই লেখেন। ১৫এপ্রিল ২০১৫ একটি সেমিনারে বইটি প্রকাশের উদ্যোগ নেন। কিন্তু আহমেদাবাদ পুলিশ ওই বই প্রকাশ করার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। সুতরাং এক্ষেত্রে তাঁর ১১টা বছর তো বরবাদ করেদিল। তার ওপর তার মতপ্রকাশের অধিকারও হরণ করা হল। অথচ তিনি নির্দোষ।

আমরা প্রতিটা ভারতবাসী দেশের আইন, বিচার ও প্রশাসনের প্রতি শ্রদ্ধা ও আস্থাশীল। কিন্তু বারে বারে ভিক্টিমাইজ হচ্ছে দেশের সংখ্যালঘু ও দুর্বল সম্প্রদায়ের মানুষ। বিচারাধীন বন্দি জীবন কাটছে এত দীর্ঘ মেয়াদের যা সর্বোচ্চ সাজার মেয়াদের দ্বিগুন তিন গুনেরও অধিক। তারপর সেই ভিক্টিম ব্যক্তিটা নির্দোষ হিসেবে মুক্তি পাচ্ছেন। এমনটা বারে বারে কেন হচ্ছে?

বৃহত্তর ও শক্তিশালী গণতান্ত্রিক দেশের বিচার ব্যবস্থা ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে কোন ফাঁকফোঁকর থেকে যাচ্ছে? এই প্রশ্ন কিন্তু উঠছে। দোষীদের দ্রুত বিচার হোক এবং প্রমাণসাপেক্ষ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি অবশ্যই কাম্য। বিচারের দীর্ঘসূত্রীতায় অনেক ক্ষেত্রে বিচারের পাশে অবিচারও হয়ে যাচ্ছে, সেটা হল ভাবা দরকার।

জঙ্গি কিম্বা নাশকতার অভিযোগে ধৃতকে দ্রুত দোষি সাব্যস্ত করা সম্ভব না হলে তাকে জেল কাস্টোডির বাইরে রেখে বিচারপ্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়ার যে দাবি উঠছে সেটার বিষয়ে বিচারবিভাগ ও প্রশাসনের ভাবা উচিত। আর যদি জেল কাষ্টোডিতেই রাখা হয় তাহলে দ্রুত বিচার পর্ব সম্পন্ন করা উচিত। কিন্তু যদি দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হয়ে যায় এবং শেষে নির্দোষ প্রমাণিত হয় তাহলে ভিক্টিমকে উপযুক্ত ক্ষতি পূরণের দাবি কি মানবিক নয়। এটা বিচারবিভাগকে ভাবা উচিত। ভাবুন দেশের জনগণও।

লিখেছেন মহঃ আব্দুল মোমেন
শিক্ষক, সাতুলিয়া ইসলামিয়া সিনিয়র মাদ্রাসা, ভাঙ্গড়: দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা

Facebook Comments