“লাভ জিহাদ” একটি অস্তিত্বহীন তত্ত্ব, লাভ জিহাদ কী? বিস্তারিত আলোচনা করলেন সালাউদ্দিন সেখ

“লাভ জিহাদ” একটি অস্তিত্বহীন তত্ত্ব,
লাভ জিহাদ কী? বিস্তারিত আলোচনা করলেন সালাউদ্দিন সেখ

পাঠকের কলমে, বেঙ্গল রিপোর্ট:
উগ্র বিজেপি সরকার দ্বারা প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষ ভাবে দেশের মুসলিমদের উপর একেরপর এক জুলুম ধেয়ে আসছে। কখনো গো রক্ষার নামে, কখনো জোর করে জয়শ্রীরাম বলার মাধ্যমে, কখনো লাভ জিহাদের নামে মুসলিম যুবকদেরকে পিটিয়ে খুন করা হয়েছে।

উপরোক্ত বিষয় গুলোর মধ্যে তথাকথিত লাভ জিহাদকে উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা দেশের সামনে আবার নতুন ভাবে হাজির করেছে। এই লাভজিহাদের ফাঁদে পড়ে নাকি হাজার হাজার হিন্দু তরুণী মুসলিম যুবককে বিবাহ করে মুসলিম হয়ে যাচ্ছে। লাভ জিহাদের ভুয়ো অভিযোগ তুলে উগ্র হিন্দুত্ববাদী গুণ্ডাবাহিনী দ্বারা কতশত সুখের সংসার নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এবং বিশেষ করে মুসলিম যুবকদেরকে বিভিন্ন ভাবে হেনস্থা করা হচ্ছে দেশজুড়ে।

তাদের ভাষায় লাভ জিহাদের অর্থ হলো- “মুসলিম যুবকেরা নিজের নাম গোপন রেখে বিভিন্ন ভাবে প্রলোভন দেখিয়ে হিন্দু তরুণীদেরকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে বিয়ে করে তারপর জোর পূর্বক ধর্মান্তরিত করে মুসলিম বানায়”।
তাদের আরো অভিযোগ, এটা নাকি মুসলিমদের ধর্মীয় স্বীকৃত একটি বিষয় এবং দেশে মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে তারা এই কাজ করছে।
আর তাই এই তথাকথিত লাভ জিহাদের নামে আন্তঃধর্মীয় বিবাহ আইনিভাবে বন্ধ করার জন্য বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে কঠোর আইন পাশের হিড়িক পড়েছে।

•আসুন দেখে নেওয়া যাক মুসলিমদের ধর্মীয় কিংবা সামাজিক ভাবে তথাকথিত লাভজিহাদের আদৌ কোনো অস্তিস্ত্ব আছে কি না•

সত্যি বলতে ইসলামে কুরআন কিংবা হাদীসের কোথাও এমন নির্দেশ কেউ দেখাতে পারবে না যেখানে বলা হয়েছে যে, কোনো অমুসলিমকে প্রেম-প্রণয়ের মাধ্যমে তাকে বিয়ে করে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করতে হবে। বরঞ্চ ইসলাম প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষ দ্বারা বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ককে হারাম ঘোষণা করেছে। সেখানে প্রেম-প্রণয় ভালোবাসার প্রশ্নই আসে না।
আল্লাহ এই বিষয়ে কুরআনে বলেন- ‘মুমিনদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গের হেফাজত করে। এতে তাদের জন্য খুব পবিত্রতা আছে।’ (সুরা: নুর, আয়াত নং:- ৩০)।

একটি হাদীসে নবী মোহাম্মদ সাঃ বলেন, “কোন পুরুষ যদি কোন নারীর সাথে নির্জনে একত্রিত হয় সেখানে শয়তান থাকে তৃতীয় ব্যক্তি”। [সুনানে তিরমিজি (২১৬৫) ]
অপর একটি হাদীস আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, মোহাম্মদ (সা.) বলেছেন, চোখের জিনা হলো দেখা, জিহ্বার জিনা হলো কথা বলা আর কুপ্রবৃত্তি কামনা ও লালসা সৃষ্টি করে এবং যৌনাঙ্গ তা সত্য অথবা মিথ্যা প্রমাণ করে (যৌন কর্মে লিপ্ত হতে পারে, অথবা নাও হতে পারে)।’ (বুখারি, হাদিস : ৬২৪৩) l

সুতরাং একজন মুসলিম পুরুষের জন্য যেকোনো ধর্মের প্রাপ্ত বয়স্ক নারীর প্রতি লোলুপ দৃষ্টি দেওয়া কিংবা প্রেমের নামে তাকে নিয়ে কল্পনায় ভাবা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

দ্বিতীয়ত, ইসলাম কাউকে জোর করে ধর্মান্তরিত করার নির্দেশ দেয়নি। ইসলামের সৌন্দর্য্যে মুগ্ধ হয়ে স্বেচ্ছায় কেউ মুসলিম হলে ভিন্ন কথা। অপরদিকে শুধুমাত্র বিয়ের উদ্দেশ্যে ধর্ম পরিবৰ্তন ইসলামে গ্রহণযোগ্য নয় বলে অধিকাংশ উলামাদের মত রয়েছে। কারণ এক্ষেত্রে এটি একটি গুনাহের কারণ হয়ে যেতে পারে, যাকে ইসলামের পরিভাষায় রিয়া অর্থাৎ লোকদেখানো ইবাদত বলা হয়। ইসলামে ধর্মের নামে লোক দেখানো কোনো কাজ করলে সেটাকেও ইসলাম একপ্রকার পাপ বলে ঘোষণা করেছে (শিরক)। অর্থ্যাৎ আল্লাহর নির্দেশগুলিকে পালন করার জন্য চায় স্বেচ্ছায় আল্লাহর প্রতি তার বাণীর প্রতি ভালোবাসা, আনুগত্যময় পরিষ্কার অন্তর। নচেৎ কোনো ব্যাক্তির ভয়ে শুধুমাত্র লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে ইসলাম ধর্মের নির্দেশ পালনে আল্লাহর নিকট কোনো ইবাদত গ্রহণযোগ্য হবে না, বরং সেটা আরো পাপ হয়ে যাবে।
আল্লাহ তাআলা রিয়াকারী (অহংকারী) অর্থাৎ লোক দেখানো ইবাদতকারীর শাস্তিও বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘অতএব দুর্ভোগ সে সব নামাজিদের জন্য; যারা তাদের নামাজ সম্পর্কে বেখবর; যারা তা লোক-দেখানোর জন্য করে।’ (সুরা মাউন: ৪-৬)।

নবি মোহাম্মদ সাঃ লোক দেখানো ইবাদতকারীকে তার ইবাদতের ব্যাপারে সতর্ক করেছেন।
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ সাঃ বলেছেন, ‘আমি তোমাদের ওপর যা ভয় করি তার মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর হচ্ছে শিরকে আসগর তথা ছোট শিরক।’ তাঁরা (সাহাবায়েকেরাম) বলল, হে আল্লাহর রাসুল! শিরকে আসগর কি ? তিনি বললেন, ‘রিয়া’ (লোক দেখানো ইবাদত)।
সুতরাং কাউকে জোর করে ধর্ম পালনে বাধ্য করা ইসলামের কোনো উপকার হবে না। কেউ যদি কাউকে তা পালনে বাধ্য করেন তাহলে সে ব্যাক্তি নিজেও পাপের অংশীদার হবেন। কারণ তিনি অপরকে একটি শিরক মূলক (ইবাদতে আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরীক করা) গুনাহের প্রতি বাধ্য করছেন।
অতএব এই তথাকথিত লাভজিহাদের সঙ্গে মুসলিম সমাজ কিংবা ইসলামকে জড়িয়ে দিয়ে দোষী সাব্যস্ত করা একটি অন্যায় প্রচেষ্টা।

তাদের আরেকটি ঠুনকো অভিযোগ রয়েছে যে, মুসলিম যুবকরা নাকি নিজেদের নাম গোপন রেখে হিন্দু তরুণীকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে!
অথচ বর্তমান সময়ে এটা প্রায় অসম্ভব। হিন্দু-মুসলিম ছেলে-মেয়ের অধিকাংশ প্রেমের বিষয়টা স্কুল-কলেজে একসঙ্গে পড়াশোনা করার সময় ঘটে যায়। তারা যদি একই স্কুল-কলেজে পড়াশোনা করে তাহলে কি ধর্মের বিষয়টা আর গোপন থাকে! আর অন্যান্যদের ক্ষেত্রে যদি এটা ঘটেও থাকে তাহলে তো একসময় তার এই গোপনীয়তা ফাঁস হবেই। তারপর ছেলেটা একজন প্রতারক বলে বিবেচিত হবে। মনে হয় না বর্তমানের কোনো মেয়ে এই ধরণের কোনো প্রতারক ছেলের সঙ্গে তার সম্পর্কের ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে, যেখানে বর্তমানে স্কুল-কলেজের ছেলে-মেয়েদের সামান্য কারণে তাদের প্রেম-প্রণয়ের সম্পর্কের বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটতে দেখা যায়।

আসলে লাভজিহাদ কি!
লাভজিহাদ হলো উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলির মুসলিম বিদ্বেষী একটি অপপ্রচার মাত্র। মুসলিমদেরকে দেশে বিভিন্ন ভাবে কোনঠাসা করার চেষ্টা করা হচ্ছে এটা তারই একটি অপচেষ্টা মাত্র। সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার করে এবং বিভিন্ন লিফলেটের মাধ্যমে কট্টোর হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলি তথাকথিত লাভজিহাদকে নিয়ে যেভাবে অপপ্রচার চালিয়েছে তাতে বর্তমানে দেশের অনেক অমুসলিমগণও হয়তো ভাবছেন যে সত্যিই হয়তো লাভজিহাদ বলে ইসলামে কিছু রয়েছে। আমরা এই বিষয়ে উপরে উল্লেখিত ধর্মীয় তথ্য থেকে পরিষ্কার প্রমান পেয়েছি মুসলিমদের ধর্মীয় কিংবা সামাজিক ভাবে তথাকথিত লাভজিহাদের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক কিংবা অস্তিত্ব কোনোটাই নেই।
হিন্দু-মুসলিম ছেলে-মেয়ের প্রেম কিংবা বিয়ের বিষয়টা অন্যান্য প্রেম-বিয়ের মতোই একটি স্বাভাবিক ঘটনা। তাদের একেঅপরকে ভালো লাগার ফলে হয়তো এটা ঘটে যায়। যেমন অনেক সময় ছেলে-মেয়ে উভয়ে মুসলিম কিংবা উভয়ে হিন্দু এমন প্রেম-প্রণয়ের সম্পর্কও গড়ে ওঠে। এর সঙ্গে ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই।

আবার অনেক সেলেব্রিটিদেরও ভিন ধর্মে বিয়ে করার বিষয়টা লক্ষ্য করা যায়। তাদের মধ্যে স্বেচ্ছায় কেউ ধর্ম পরিবর্তন করে নয়তো নিজ ধর্ম বজায় রেখে জীবন অতিবাহিত করেন।
অপরদিকে কেউ কেউ ইসলামের প্রতি মুগ্ধ হয়ে ধর্ম পরিবর্তন করেন এবং তারপর হয়তো বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হোন। তথাকথিত লাভজিহাদের সঙ্গে এরও কোনো সম্পর্ক নেই।

কিন্তু না RSS VHP বজরং দল প্রভৃতি উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন গুলি তাদের উগ্র মস্তিস্ক প্রসূত ভাবনায় যেকোনো ভাবে ইসলামকে এখানে জড়িয়ে দিতে চায় এবং এনিয়ে তারা দেশজুড়ে তোলপাড় তুলেছে‌। তারা সোশ্যাল মিডিয়া সহ বিভিন্ন লিফলেটের মাধ্যমে আন্তঃধর্মীয় বিবাহ বিষয়টিকে লাভজিহাদ নাম দিয়ে মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ভরে প্রতিনিয়ত প্রচারণা চালাচ্ছে সারাদেশে। যার ফলে মাঝেমধ্যে তাদের লাঠিয়াল গুন্ডা বাহিনী দ্বারা লাভ জিহাদের ভূয়ো অভিযোগে মুসলিম যুবকদের খুন-আক্রান্ত কিংবা হেনস্থা হতে হয়।

অবাক লাগে আন্তঃধর্মীয় বিবাহ রোধে হিন্দুত্ববাদী লাঠিয়াল গুণ্ডাবাহিনীর উগ্র মস্তিস্ক প্রসূত ভাবনাগুলিকে একটি স্বাধীন ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের কয়েকটি রাজ্যে আইন হিসেবে পেশ করেছে এবং ইতিমধ্যেই মধ্যপ্রদেশ ও উত্তর প্রদেশে লাগু হওয়া উক্ত আইনের অন্যায় ব্যবহার শুরু হয়েছে। লাভ জিহাদের ভূয়ো অভিযোগে এতদিন উগ্র হিন্দুত্ববাদী লাঠিয়াল বাহিনী যে ভূমিকা রাখতো, বর্তমানে উক্ত রাজ্যগুলির পুলিশ সেই ভূমিকায় অবতীর্ন হয়েছে।

সম্প্রতি ইউপির আন্তঃধর্মীয় বিবাহ প্রতিরোধ আইনের বলে প্রথম বলি হয়েছে ইউপির মোরাবাদের এক দম্পতি। অভিযোগ তাকে জোর করে গর্ভপাতের ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে এবং তার স্বামীকে উক্ত আইনের বলে জেলে ভরা হয়েছে। শুধু তাই নয়, যোগী রাজ্যের অন্য আরেকটি ঘটনায় দেখা গেছে যে, পাত্র-পাত্রী উভয়ে মুসলিম হওয়া সত্বেও কুশিনগরের স্থানীয় লাঠিয়াল হিন্দু যুব বাহিনীর সদস্যদের দেওয়া অভিযোগের ভিত্তিতে সদ্য বিয়ের আসরে বসা নব হবু দম্পতিকে রাতভর থানায় আটকে রেখে পুলিশ বিভিন্ন ভাবে হেনস্থা করেছে।
কুশীনগরের হবু বর হায়দার আলির অভিযোগ, পুলিশ তাকে থানায় আটকে রেখে বেল্ট দিয়ে মেরেছে এবং অন্য একটি ঘরে তার হবু স্ত্রী শাবিলাকে আটকে রাখে ও পুলিশ তার পরিবার সম্পর্কে জানতে চায়। কিন্তু আতংকিত শাবিলা ভয়ে কিছু বলতে পারছিলেন না। একসময় শাবিলা পুলিশকে তার ভাইয়ের ফোন নম্বর দেন এবং পুলিশ জানতে পারেন যে পাত্র-পাত্রী উভয়ে মুসলিম। তথাকথিত লাভ জিহাদের ভূতে আতংকিত যোগীর পুলিশের এই ভূল ঘটনায় কোনো অন্যায় দেখছেন না তারা, উল্টো পুলিশের সাফাই- তাদের এই ঘটনায় মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়নি এবং আন্তঃধর্মীয় বিবাহ রোধে যে রাজ্যে যে নতুন আইন চালু হয়েছে সেটাই তারা বজায় রাখার চেষ্টা করছেন। উল্লেখিত ঘটনায় যারা ভূয়ো অভিযোগ জানিয়েছিল তাদের বিরুদ্ধেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি যোগীর পুলিশ।
এটি একটি অত্যন্ত মর্মান্তিক বিষয়। মানুষের স্বাধীন জীবন-যাপনকে চরম ভাবে দুর্বিসহ করে তোলা হয়েছে এখানে।

সর্বোপরি ভারত একটি ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে স্বধর্মীয় কিংবা আন্তঃধর্মীয় যেকোনো রূপ বিবাহের বিষয়গুলি নিয়ন্ত্রণ কিংবা নজরদারি করার সরকারের আয়ত্তের মধ্যে পড়ে না। একটি স্বাধীন ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সবার অধিকার রয়েছে কারো ক্ষতি না করে নিজ নিজ ভাবনা ইচ্ছা অনুযায়ী স্বাধীন সুন্দর ভাবে জীবনযাপন করার। আন্তঃধর্মীয় বিবাহ প্রতিরোধে আসাম, হরিয়ানা সহ কয়েকটি বিজেপি শাসিত রাজ্যে যে কঠোর আইন আনার প্রস্তাব পেশ করেছে এবং ইতিমধ্যে মধ্যপ্রদেশ ও উত্তর প্রদেশে উক্ত আইন যেভাবে লাগু করা হয়েছে তা একটি রাষ্ট্রের স্বাধীনসত্তা কাঠামোকেই চ্যালেঞ্জ করেছে।

লিখেছেন, সালাউদ্দিন সেখ।
জঙ্গিপুর, মুর্শিদাবাদ জেলা।
ছাত্র-B.Tech JNTU-Hyderabad

Facebook Comments