অপরিকল্পিত লকডাউনে লক্ষাধিক সাধারণ মানুষের হাহাকার চাপা দিতেই পরিকল্পিতভাবেই নিজামুদ্দিন মারকাজকে পণবন্দি করা হয়েছে: ইফতেখার হোসেন

অপরিকল্পিত লকডাউনে লক্ষাধিক সাধারণ মানুষের হাহাকার চাপা দিতেই পরিকল্পিতভাবেই নিজামুদ্দিন মারকাজকে পণবন্দি করা হয়েছে: ইফতেখার হোসেন

পাঠকের কলম, বেঙ্গল রিপোর্ট: করোনা ভাইরাস মহামারী নিয়ে বিশ্ব যখন কাঁপছে, মানুষের মৃত্যু মিছিল আটকাতে পরাক্রমশালী রাষ্ট্র নেতাদের ধমণী বেয়ে রক্তের হিমস্রোত বয়ে চলেছে … তখনো আমাদের দেশের রাষ্ট্র নেতারা বালখিল্য আচরণ দেখিয়ে চলছিল। ১২ই মার্চ WHO করোনা ভাইরাসকে মহামারী ঘোষণার পরেও চৌকিদার মহাশয় জাতির উদ্দেশ্যে ১৯শে মার্চ দিশাহীন ভাষন দিলেন। ২২শে মার্চ ১৪ ঘন্টার জনতার কার্ফু ও বাবাজির ঘন্টা বাজানোর নিদান দিয়ে যে করোনা ভাইরাস রোধ করা যাবে না তিনি ও ভক্তকূল ছাড়া আপামর জনসাধারণের মনে কোন সন্দেহ ছিল না।

এরপরে বিভিন্ন অবিজেপি রাজ্য সরকার লকডাউনের পথে হাঁটতে শুরু করে দেখে কেন্দ্র সরকারও ১৫শে মার্চ দেশ জুড়ে একুশ দিনের জন্য লকডাউন জারি করে। মাঝে অনেকটা মূল্যবান সময় নষ্ট হয়। ১৩০ কোটি মানুষের দেশে মাত্র চার ঘন্টার ব্যবধানে লকডাউন একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত ছিল। জাতির উদ্দেশ্যে ১৯ তারিখের ভাষনেই যদি ২৫ তারিখ থেকে লকডাউনের কোনরূপ পূর্বাভাস দিতেন, তাহলে দেশ জুড়ে লক্ষ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ শহরাঞ্চলে আটকে পড়ত না, নিজামুদ্দিন মরকজেও হাজার খানেক তবলিগ জামাতের সদস্য অবরুদ্ধ হতেন না।

দ্বিতীয় বারের জন্য মোদী জী দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়ে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠের জোরে একাধিক সংবিধান বিরোধী ও জনবিরোধী আইন প্রণয়ন করেছেন। সর্বশেষ নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন-২০১৯ নিয়ে দেশ জুড়ে বিজেপি-আরএসএস বিরোধী আন্দোলনের ঝড় ওঠে।

সিএএ এনপিআর এনআরসি বিরোধী আন্দোলনের মাঝেই কয়েকটি রাজ্যে ক্ষমতা হারিয়ে বিজেপি যখন দিশেহারা, ঠিক তখনই ঘটে যায় দিল্লি গণহত্যা। দেশ-বিদেশে মোদী সরকারের ইমেজ ভূলন্ঠিত হয়। কিন্তু করোনা ভাইরাসের হাত ধরে আরো একবার বিভাজনের রাজনীতিকে সামনে এনে মোদী সরকার চরম নির্লজ্জতা ও বর্বরতার সীমা লঙ্ঘন করল।

নিজামুদ্দিন মারকাজের ঘটনা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে প্রচুর তথ্যের আদান প্রদান হয়েছে। বিস্তারিত আলোচনা নিষ্প্রয়োজন, শুধুমাত্র কিছু অপপ্রচার ও প্রোপাগান্ডা তুলে ধরা যাক। তন্মধ্যে উল্লেখ্য :
** লকডাউন অমান্য করে জমায়েত।
** করোনা ভাইরাস আবহে বিদেশী নাগরিকদের উপস্থিতি।
** মৌলানা সাদ এর বেশ কিছু অডিও করোনা ভাইরাস সংক্রান্ত বিষয়ে চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞদের মতামতের বিরুদ্ধে জনগনকে উস্কানিমূলক।
** নিজামুদ্দিন মারকাজ থেকেই দেশ জুড়ে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে দেওয়ার চক্রান্ত।
**হযরত নিজামুদ্দিন থানার অফিসার ২৩শে মার্চ মারকজ খালি করতে বললেও মৌলানা সাদ কর্ণপাত করেননি। উপায়ন্তর না দেখে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ২৮-২৯ তারিখ রাত দু’টোর সময় জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভালকে মারকাজে পাঠান ও মৌলানা সাদ এর সাথে কথাবার্তা বলেন।

আর কিছু ভাবার আগে এখানেই থামা যাক। অমিত শাহ ও অজিত ডোভাল একটি মারকাজ বা সামাজিক সংগঠনের মূল ভবনে, লকডাউনে আটকে পড়া হাজার খানেক লুকিয়ে থাকা ভাইরাস বোমাকে নিষ্ক্রিয় করতে মাঠে হাজির হয়েছেন মানেই…. গোদী মিডিয়া ও রাষ্ট্র যন্ত্র ঝাপিয়ে পড়বে, অবাক হওয়ার কিছু নেই। এবার মিলিয়ে দেখুন, ২৩ তারিখ থানায় ডেকে মারকাজ খালি করতে বললেও পুলিশ সাহায্য করতে রাজি হয়নি। ২৫শে মার্চ সাদ সাহেব গাড়ির ব্যবস্থা করেও আন্ত:রাজ্য সীমান্ত সিল থাকায় পাস চেয়েও পাননি। তেলেঙ্গানায় দিল্লি মারকাজ ফেরৎ ৬ ব্যক্তির করোনা ভাইরাসে মৃত্যু ঘটার রটনা দেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রকের রিপোর্টে ঠাঁই পায়নি। জম্মু কাশ্মীরে মরকজ ফেরৎ এক ৭৮ বছর বৃদ্ধের মৃত্যুতে পূর্বের শারীরিক রোগ উল্লেখ করা হয়নি। ১৩ই মার্চের পূর্বে ইন্দোনেশিয়ার নাগরিকদের তেলেঙ্গানা পৌঁছানোর খবর বেমালুম চেপে যাওয়া হয়েছে।

সবচেয়ে বড় বিষয় এক বছর পূর্বে নির্ধারিত একটি ধর্মীয় সমাবেশে কারা যোগ দিচ্ছে সব তথ্য সরকারকে দেওয়ার পরেও করোনা ভাইরাস নিয়ে লকডাউনের মাঝে তাদের গন্তব্যস্হলে ফেরার বিষয়ে সাহায্য না করে পণবন্দি করা হল কেন? সমাবেশ ছিল ১৩-১৫ই মার্চ। অধিকাংশ অংশগ্রহণকারী ফেরত যান। প্রায় হাজার খানেক মানুষ আটকে পড়েন।

যদিও ওইসংখ্যক মানুষ বছরভর নিজামুদ্দিন মরকজে হামেশাই থাকেন। তারা ছোট ছোট টিম আকারে দেশের বিভিন্ন রাজ্যে ছড়িয়ে পড়েন। আবার অন্যেরা উপস্থিত হন। দিল্লি ও কেন্দ্র সরকারের চোখের সামনে দেশের রাজধানীতে লুকিয়ে কিছুই ঘটে না। পুরো বিষয়টি সরকার ও পুলিশ প্রশাসনের অনুমতিক্রমে চলে আসছিল। হঠাৎ ২০২০ সালে করোনা ভাইরাসকে সামনে রেখে নিজামুদ্দিন মারকাজকে কাঠ গোড়ায় দাঁড় করানো হচ্ছে কেন?

তবলিগ জামাত কখনও দেশের রাজনীতি বা সরকারকে নিয়ে কোনও মন্তব্য বা আলোচনা করে না। তবলিগ জামাত কখনও মুসলিম ধর্মাবলম্বী মানুষ ছাড়া অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের সাথে ধর্মের বিষয়ে আলোচনা করে না। তারা মুসলিমদের সামাজিক অপরাধ যেমন ধর্ষন ও শ্লীলতাহানি থেকে বিরত থাকতে বলে, মদ খেতে নিষেধ করে, চুরি, ডাকাতি করতে নিষেধ করে… এক কথায় ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলার পরামর্শ দেয়, সৎ কাজের আহ্বান জানায় ও অসৎ কাজ থেকে বিরত থাকতে বলে। করোনা ভাইরাস নিয়ে জনতার কার্ফু ও লকডাউন ঘোষনার পরেও দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ছবি, বহু ধর্মীয় স্হানের ছবি, লক্ষাধিক পরিযায়ী শ্রমিকদের রেলওয়ে স্টেশন, বাস স্ট্যান্ড ও হাইওয়ের ছবির কাছে নিজামুদ্দিন মারকাজের ঘটনা নেহাতই তুচ্ছ।

তাহলে নিজামুদ্দিন মারকাজ ও তাবলিগ জামাতকে কি মোদী সরকার টার্গেট করেছে? এক কথায় উত্তর: হ্যাঁ। তবলিগ জামাতকে খৃষ্টান মিশেনারিদের মতো করে ইসলাম ধর্মের প্রচারক হিসেবে চিহ্নিত করে ট্রিট করার ষড়যন্ত্র রচিত হয়েছে। করোনা ভাইরাসের আতঙ্ক ও ভয়াবহ পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে সরকারের যাবতীয় ব্যর্থতা চাপা দিয়ে নাগরিক কর্তব্যকে হাতিয়ার করে তবলিগ জামাতের ধর্মীয় কাজকর্ম স্তব্ধ করার নিকৃষ্ট মানসিকতা প্রকাশ্য। নিজামুদ্দিন মারকাজে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারে কেজরীওয়াল সরকারের কোন এমএলএ, মন্ত্রীকে দেখা গেল না।

স্হানীয় বিজেপি কাউন্সিলর, এমপি বা কেন্দ্রের কোন নেতা মন্ত্রীদের দেখা গেল না। হাজার খানেক ভাইরাস বোমা নিষ্ক্রিয় করতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পরামর্শে একেবারে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাকে রাত দু’টোর সময় যেতে হল। এরপূর্বে দিল্লি গণহত্যার সময়েও একই চিত্র দেখা গিয়েছে। তিনদিন ধরে বিজেপি-আরএসএস পুলিশের সাহায্যে গণহত্যা ও অগ্নিসংযোগ চালানোর পরে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মাঠে নামেন… সেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পরামর্শে। আরো একটু পিছিয়ে গেলে স্মৃতির আড়ালে চলে যাওয়া একটি ছবি ভেসে উঠবে… অবরুদ্ধ কাশ্মীরে দাঁড়িয়ে বিরিয়ানি খাওয়ার ছবি।

গণতান্ত্রিক ভারতে রাজনৈতিক পরিবেশ সংকুচিত হয়ে পড়ছে এবং পুলিশি রাষ্ট্রের দিকে এগিয়ে চলেছে। এইজন্যই সীমান্ত থেকে সিভিল বিষয়েও NSA কে কাজে লাগানো হচ্ছে। শক্তিশালী বিরোধী রাজনৈতিক দলের অনুপস্থিতিতে রাজনৈতিক পরিসর ক্ষুদ্র হতে বিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

একটি ছোট আবেদন : দিল্লি নিজামুদ্দিন মারকাজে ১৩-১৫ই মার্চ সমাবেশে বাংলা থেকে যারা যোগদান করেছিলেন এবং তারপরেও যারা ওখান থেকে রাজ্যে এসেছেন তারা প্রত্যেকেই রাজ্য সরকারের আহ্বানে সাড়া দিয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকদের সাথে যোগাযোগ করুন। তাদের সংস্পর্শে যারা এসেছিলেন তারাও হোম কোয়ারান্টিনে থাকুন এবং নিজেদের প্রতি সতর্ক থাকুন। করোনা ভাইরাস সম্পর্কিত লক্ষণ দেখা দিলেই নিকটবর্তী স্বাস্থ্য কেন্দ্রে যোগাযোগ করুন। আপনারা কেউ অপরাধী নন, তাই আত্ম গোপনে থেকে নিজের ও পরিবারের সদস্যদের জীবনের ঝুঁকি নেবেন না।

Facebook Comments