বর্তমান বিশ্ব : সেক্যুলারিজম ও মানবতা

সফিকুল গাজী, বেঙ্গল রিপোর্ট: জাতি, উন্নতি, দুর্নীতি- এ ত্রয়ীর উচ্চারণে অন্তমিল থাকলেও প্রথমটির জন্য দ্বিতীয়টির যতটা প্রয়োজন, দ্বিতীয়টির ক্ষেত্রে তৃতীয়টি ততোধিক ক্ষতিকর এবং বর্জনীয়।কেননা আমরা জানি অসৎ বা অবৈধ সুবিধা লাভের জন্য মানুষ পরিচালিত কার্য কলাপের নামই দুর্নীতি।
অপরদিকে উন্নতি হল পরিকল্পিত কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে অবাঞ্ছিত অবস্থা থেকে বাঞ্ছিত অবস্থায় উত্তরণ। সাধারণ ভাবে সারা বিশ্বেই এটা অবশ্যই বিশ্বাস যোগ্য যে দুর্নীতি জাতীয় উন্নতির অন্তরায়। আর জাতীয়তাবাদ মানব মনের অন্তরালে লুক্কায়িত থাকা অমিত এক শক্তি,যা চিরন্তনী,যা দৃঢ় সত্য। তাই মানুষের সর্বদা সত্যের উপরে দাঁড়িয়ে সামাজিক প্রাসাদের ভিত্তিভূমি রচনা করতে হয়। তা যদি না করে অর্থাৎ সত্যের সঠিক জ্ঞানবোধ যদি তার না থাকে তবে সত্যনিষ্ঠ মানুষ হওয়া অসম্ভব।
হিমালয় পর্বত গড়তে পারে, কিন্তু অসত্য মানুষ কখনই সামাজিক স্বীকৃতির শিখরে আরোহণ করতে পারে না। কোরান, পূরাণ, বেদ-বেদান্ত, বাইবেল, ত্রিপিটক, জেন্দাবেস্থা, গ্রন্থসাহেব, সমস্ত ধর্মগ্রন্থের একটাই নির্যাস, একটাই স্রোত তা হলো শান্তি প্রতিষ্ঠা, সত্যের উপরে অবিচলিত থাকা এবং বিশ্বাসের ভিত্তিভূমি সুদৃঢ় করা।
তাই ধর্মের বর্ম নয়, বরং মানবিকতা ও মনুষ্যত্বের চর্ম পরে সমাজ থেকে সাম্প্রদায়িকতার বিষ চিরতরে বিলীন করে দেওয়ার অভীপ্সাই আমাদের এগিয়ে আসা দরকার। এই চিরন্তনী সত্যকে মেনে নিতেই হয়। কিন্তু দুর্ভাগ‍্যক্রমে স্বার্থান্বেষী ও ক্ষমতাদর্পি কিছু মানুষের হীন উদ্যেশ্য মানুষে মানুষে ভেদাভেদ সৃষ্টি করতে প্রয়াসী।তারা ধর্ম, বর্ণ ও সম্প্রদায়গত পার্থক্য উসকে দিয়ে জাতিগত বিভেদ ও শ্রেণীগত বৈষম্য সৃষ্টি করে। ফলে সমাজ ও দেশে দেখা দেয় সংঘাত,সংঘর্ষ ও হানাহানি।
“আপনি আচরি পরমঃ ধর্মঃ” অর্থাৎ নিজকৃত আচার -আচরণই প্রকৃত ধর্ম।অথচ আমরা মানুষ হয়ে মনুষ্যত্বের ধর্ম ভুলতে বসেছি, হারাতে বসেছি মানবিকতা, মানবপ্রেম, জীবপ্রেম তথা বিশ্বভ্রাতৃত্ববোধ। আজ মনুষ্য জাতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে অস্থি,স্নায়ু,মজ্জার পরতে পরতে জান্তব বৈশিষ্ট্যের আকর, আঁতুড় ঘরের মতো আষ্টেপৃষ্টে আঁকড়ে ধরেছে।
“বাঘ বাঘের মাংস খায় না” এ কথা দৃঢ় সত্য।অথচ আমরা মানব বৈশিষ্ট্য লুক্কায়িত করে জান্তব বৈশিষ্ট্যে মজে উঠেছি।আজ আমরা হনন খেলায় চ্যাম্পিয়ান খেলোয়াড়। হিংসার প্রতিযোগিতার দৌড়ে বিদ্বেষ ভরা মন নিয়েই সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পে সমাজ সভ্যতাকে ভরিয়ে তুলছি। কেড়ে নিচ্ছি নারী শরীর, শিশুর বাঁচার অধিকার।
এই একবিংশ শতাব্দীতে পদার্পণ করে সর্বাধুনিক হয়েও আমরা নির্ভেজাল মুসলিম বা নির্ভেজাল হিন্দু কিনা এই দাবি জোরালো করে তুলেছি।
আমাদের মন ও মানসিকতায় আষ্টেপিষ্টে আঁকড়ে ফেলেছি সেকুরালিজমের বেড়াজাল। বড়ো দুঃখ ভরা হৃদয়ে বলতে হয় সমাজ শরীরে সাম্প্রদায়িকতার পোকা আমাদের এই হীন মানসিকতার কারণেই। ভোগাকাঙ্খা ,ক্ষমতালিপ্সা ও স্বার্থরক্ষার ব্যাপারে মানুষ যখন লোভী,আত্মকেন্দ্রিক, ক্ষুদ্রমনা ও পশুর ন্যায় হিংস্র হয়ে ওঠে তখন তারা হীন স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য যে কোনো ধরনের কাজ করতে পারে। জনকল্যাণ তথা মানবতার মুক্তির গান তাদের কর্ণকুহরে প্রবেশ করে না। তাই সমাজ সভ্যতা ও দেশ বাঁচাতে নির্ভেজাল মানুষ প্রয়োজন।
সেকুরালিজম বা ধর্মীয় অনুশাসন কখনই মানবতার উর্ধ্বে উঠতে পারে না। আজ এই কলঙ্কিত নষ্ট সময়ে মানবপ্রেমের মন্ত্রে উজ্জীবিত হতে হবে মানুষকে। আর এই মানবপ্রেম ফসলের বীজ শুভ বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষদেরই বপন করতে হবে এই ক্ষরা পূর্ণ সমাজ মাটির বুক চিরে। এটা করতে পারলেই আগামীতে মানবতার চারা মহীরুহে পরিণত হবে, পৃথিবীতে বিরাজ করবে নিশ্চল শান্তি,প্রশস্ত প্রেম -ভালোবাসা। ধর্মীয় মানসিকতায় পুষ্ট হিন্দু -মুসলিম বোধ ছাড়িয়ে মানবিকতা ও জাতীয়তাবোধে আমাদের মিলনের জয়গান গাইতে হবে। বন্ধ করতে হবে “ধর্মের নামে মানুষ হত্যার”নারকীয়তা ও পিশাচীয়তা। ধর্মকে বাস্তব ও পার্থিব যুক্তি বিচারের কষ্টি পাথরে যাচাই করতে পারলেই সমাজ থেকে ধার্মিক সংকীর্ণতা মুছে ফেলা সম্ভব। মানব জমিনে সততা, সত্যবাদিতা, ন্যায়নিষ্ঠা, আদর্শবাদীতা ইত্যাদি সদগুনাবলির আবাদ করতে পারলেই মানবতার মুক্তির ফল্গুধারা প্রবাহিত হবে। ধর্মের আনুসঙ্গিক নৈবেদ্য বিশুদ্ধ ও নির্ভুল হলেও প্রকৃতপক্ষে তা হয়ে উঠবে মানবল্যাণকামী।
আমরা জানি যে সুপ্রাচীনকাল থেকে সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে আঁকড়ে সমাজ হয়েছে সনাতনী, পৃথিবী হয়েছে প্রাচীন। এই সনাতনী প্রাচীন পৃথিবীর সর্বোৎকৃষ্ট জীব মানুষের কল্যাণকামী দৃষ্টি ভঙ্গি যদি সমাজ শরীরে ছড়িয়ে দেওয়া যায় তাহলে অর্থবিত্ত বা ধার্মিক আচরণের জৌলুস মুছে প্রকৃত মানব সত্যের বীজ বপন সম্ভব। পার্থিব বা অপার্থিব সামাজিক, রাষ্ট্রিক, আধ্যাত্মিক সর্ব ক্ষেত্রেই মানবপ্রেমের স্রোতধারা এই বিশাল সমাজে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হবে। আর তা পারলেই মানবতন্ত্রের প্রকৃত বোধগম্যতা মানব মনে স্থাপিত হবেই। আমরা সনাতনী মেষবৃত্তি কে ছেড়ে পিতা মাতার সঙ্গে সন্তানের সম্পর্কের মতো সমাজের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককে যুক্তি ও বাস্তবের কষ্টি পাথরে যাচাই করতে পারি তবেই মানবতার ইতিহাস রচনা সম্ভব হবে। এভাবেই নিজের উপর বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে পারলেই মানুষের পক্ষে মনুষ্যত্বের শাসন তথা মানবতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে। ধর্মের উপর জোর না দিয়ে মানববন্ধনের উপর জোর দেওয়া উচিত।
প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য দুনিয়ার সর্বত্র মানবতার বীজ যদি ছড়িয়ে দেওয়া যায় তাহলে পৃথিবীব্যাপী মনুষত্বের মহীরুহের ছায়া, শান্তি ও শীতলতা জুড়িয়ে দেবে মানুষের প্রাণ। নীতিহীন ,মনুষত্বহীন রাজনীতির বারুদকে সমাজের পটভূমি থেকে চিরতরে পরিষ্কার করে দিতে হবে। সমগ্র পৃথিবীর বুদ্ধিজীবী মানুষদের এব্যাপারে শুভুদ্ধিসম্পন্নতা নিয়ে এগিয়ে আসতেই হবে। এটা যদি সম্ভব হয় তাহলে আমরা পৃথিবীকে এমন এক ক্ষেত্র বানাতে পারবো যেখানে মনুষ্যত্বের ফসল ফলিত হবে। বিশ্ববিধাতার সূচিপত্রে মানব ক্রিয়া কলাপই সমাজ চালায়।
তাই মানুষের আচরণ ধারার মধ্যে ধর্মের গণ্ডি পরিত্যাগ করে মানবতার সীমাহীন গগনচুম্বী প্রকৃত ধারায় মিশে যেতে পারলে পৃথিবীতে শান্তি বিরাজ করবে, ধর্মের সংকীর্ণতা ভেঙে পড়বে এবং মানবমন্ত্র ছড়িয়ে পড়বে দিকে দিকে। সেক্ষেত্রে সর্বত্র উচ্চারিত —–
” সবার উপরে মানুষ সত্য
তাহার উপরে নাই।”
 
ছবি : পশ্চিমবঙ্গ মুসলিম বুদ্ধিজীবি মঞ্চের ফেসবুক পেজ থেকে সংগ্রীহিত 

Facebook Comments