ইতিহাসের আয়নায় বর্তমানকে দেখিয়েছেন শাহনওয়াজ আলি রায়হান 

ইতিহাসের আয়নায় বর্তমানকে দেখিয়েছেন শাহনওয়াজ আলি রায়হান 

বেঙ্গল রিপোর্ট: “এই ছুৎমার্গ, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যতা সেই ১৯৩৭-এর প্রথম নির্বাচনের সময় থেকেই আছে। আইনসভা ভদ্রলোকদের সভা, এখানে ভোটে জিতে লুঙ্গি-ফতুয়া পরে কলিকাতা এসে ফরিদপুর, বরিশাল, বাকেরগঞ্জের গ্রাম্য মোসলমানরা জনপ্রতিনিধিরা হয়ে বাংলায় বক্তৃতা দেবে ? সেসব চলবে না। কিন্তু চলতে লাগল, তাঁরাই বেশি বেশি জিতে আসতে থাকল। ব্রাহ্মণরা বুঝল এতে যেটুকু জমিদারি চলছে তাও যাবে। যদিও রাজধানী দিল্লিতে স্থানান্তর, গান্ধীর কংগ্রেসি রাজনীতিতে প্রবেশ, চিত্তরঞ্জন দাসের মৃত্যু, নেতাজির মতানৈক্য– নানা কারণে বাংলার হিন্দু নেতাদের আধিপত্য জাতীয় রাজনীতিতে অনেকটায় খর্ব হয়েছিল আগেই। এবার এইসব গাঁয়ের মোসলমান প্রজাদের সাথে ইডেনের গার্ডেন্সের হাইকোর্ট প্রান্তের ওই গোলবাড়িটায় বসলে তো জাতও যাবে –আদতে তো এরা সব ওই নিম্নবর্ণ থেকেই ধর্মান্তরিত,ধানের জমিতে কাজ করা গোলামের জাত । দেশটা ভাগ হল। নানা বয়ান রচিত হল দেশভাগের। বাংলা ভাগের পেছনে কলকাতার স্থপতিরা অনেকেই বেনিফিট অফ ডাউট পেলেন এপারের ইতিহাস রচনায় ! জিন্নাহ-মুসলিম লীগের মত প্যান-ইন্ডিয়ান ক্যানভাসে দেখা হতে লাগল বাংলা ভাগকেও, স্থানীয় কারণ এড়িয়ে যাওয়া হতে লাগল। কলকাতায় রাস্তা হল শ্যামাপ্রসাদের নামে । হ্যাঁ, সেই শ্যামা-হক মন্ত্রিসভার শ্যামা। নেহরু মন্ত্রীসভারও। সেদিন একটা ভিডিওতে দেখলাম পাটুলির সেন্টারের এক অধ্যাপক হোলোকাস্ট স্টাডিজ, ট্রমা স্টাডিজ নানা বিষয়ের সাথে মিলিয়ে দেশভাগে ওপার থেকে কলকাতায় আসা উদ্বাস্তুদের যন্ত্রণার কথা, বহুযুগ পর তাঁর বাপ-দাদার স্মৃতিবিজড়িত ঢাকার গেন্ডারিয়া সফরের কথা বললেন। অন্য ভূখণ্ডের অধিবাসীদের যাতনার অভিজ্ঞতার সঙ্গে এরকম তুলনামূলক পাঠ গবেষণাকে সমৃদ্ধই করে।

যেমন বুঝতে সুবিধা হয়, হিটলারের অধীনে কিভাবে ধাপে ধাপে ইহুদিদের কখনও রাজনৈতিক অধিকার কেড়ে, কখনও আইনি অধিকার খতম করে অন্তিমে কনশেনট্রেশনে যাওয়ার পথ প্রশস্তকরণের বয়ানের সঙ্গে ভারতের মুসলিমদের বর্তমান অভিজ্ঞতা, আদালতে মসজিদের জমির মামলা হারা, ডিটেনশন ক্যাম্পে যাওয়া, লিঞ্চ হওয়া সবকিছু মিলিয়ে পড়লে। এত গেল অনুধাবনের স্তর, কিছু না পড়লেও কাশ্মীর থেকে আসামের দিকে চোখ ফেরালে বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা না কিভাবে ভারতীয় মুসলিমদের নিয়ে নাৎসি জামানার আদলে রাজনীতি করছে বিজেপি। প্রতিবাদের বেলায় ? ক্যা-পাশ হওয়ার দিন সাতজন সাংসদ ভোটাভুটির সময় অনুপস্থিত। ছিলেন না সেই বসিরহাটের নায়িকা সাংসদও, যার সকল কার্যকলাপ মেনে নেয়া না নেওয়ার ওপর থেকে থেকেই বাংলার মুসলমানদের আধুনিকতা /পশ্চাদপদতার ইউনিট টেস্ট নির্ভর করে। যেমন শিক্ষিতদের মেনে নিতে হয় পার্টির দেয়া আরাবুল,শওকত বা মজিদ মাস্টারকে। চারদিন সময় লেগেছিল দিদিকে রাস্তায় নামতে । সেই চার-পাঁচদিন বাংলার অসংখ্য মুসলিমের কাছে ছিল চার দশক– এক সাথে খেলে বড় হওয়া, চায়ের দোকানে আড্ডা দেয়া প্রতিবেশীটাও সে রাতে বিল পাশের খুশিতে পটকা ফাটিয়েছিল। সেই অসহায় দশা থেকেই কোথাও কোথাও রেলের সম্পত্তি ভাঙচুর । দলীয় নির্দেশনা পাওয়ার আগে অনেকেই এগিয়ে আসেনি পাশে আছি বলতে। শেষে কলকাতার সভার পর জেলাগুলোতে যখন কিছু দলীয় সভা হল তাও বেছে বেছে মুসলিম এলাকায়–যেন মুসলিমরাই সংসদে ক্যা পাশ করেছে, ওদের ভুলগুলো ধরিয়ে দেয়া উচিৎ ! রাজপথে নেমে যখন বিনা দলীয় ব্যানরে কোনও স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ করতে গেছে মুসলিম যুবকরা- তাঁদের এসে পিটিয়েছে পুলিশ, সুজাপুর ঈদগাহে সারি সারি গাড়ি ভাঙছে পুলিশ সে ভিডিও ভাইরাল হয়েছে । তৃণমূল করা যুবকরাও সেই মিম সমর্থক আখ্যায়িত হয়েছে – দোষ একটাই দলের ব্যানারের বাইরে সাধারণ জনতার মিছিলে তাঁরা শামিল হয়েছে ! অনেক মুসলিম যুবককে থানায় মিম বলে ডেকে হেনস্থা করা হয়েছে, অনেকে রাতে পুলিশের ভয়ে ঘুমাতে পারেনি বাড়িতে।

কংগ্রেসের মুসলিম বিধায়করা প্রদেশ কংগ্রেসের ক্যা-এনআরসি ইস্যুতে গড়িমসি, অধীরের সময়ে সময়ে মমতাকে ঘিরতে অতি-সক্রিয়তা কিন্তু মোদীতে দুর্বলতা দেখে কাছের লোকদের কাছে প্রায়-ই অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু মুখ খোলেননি পাছে দেড় বছর পর বিধানসভার টিকিট খোয়াতে হয়। বামেদের তো একটা সেলিমকে পথে নামিয়ে দায়িত্ব শেষ- সঙ্গে ওই একটু-আধটু সূর্য-সুজনের ফেসবুক পোস্ট-ভিডিও। লকডাউনের সময় বাড়ি ফিরতে সমস্যার সম্মুখীন হওয়া ভিনরাজ্যে পরীযায়ী শ্রমিকেরা যেমন ফোনে পায়নি জঙ্গিপুরের তৃণমূল সাংসদকে, তেমনি দক্ষিণ মালদার কংগ্রেস সাংসদকেও। তবে এনারা নিশ্চয় এবার বাংলার নির্বাচনের সময় রাহুল গান্ধীর মত শিমলা বেড়াতে যাবেন না, এলাকাতেই থাকবেন। কিন্তু থেকে লাভ কি হচ্ছে ? বিহারের সবচেয়ে অনুন্নত সীমাঞ্চলের থেকেও তো খারাপ অবস্হা মুর্শিদাবাদ – মালদা -দিনাজপুর নানা জেলার মুসলিমদের। কোথাও বিশ্ববিদ্যালয় নেই, কোথাও কলেজ নেই, কোথাও হাসপাতাল নেই, আর চাকরি তো কোথাও-ই নেই– থাকলেও ভিনরাজ্যে, রাজমিস্ত্রির ! এঁরা তখনই কলকাতার বামুন কাগজগুলোতে শিরোনাম যখন এঁদের শৌচাগারের জন্য নির্মিত চেম্বার আল-কায়েদার সুড়ঙ্গ হয়– পুঁজিবাদ-তেল-ইরাক-বুশ নিয়ে এই সেদিনও রানী রাসমনিতে প্রতিবাদ করা সিপিএম-এসএফআই পর্যন্ত রা কাড়ল না ! বাকীদের কথা বাদই দিলাম।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিজেপিকে পশ্চিমবঙ্গে ঢুকিয়ে, ওদের মন্ত্রিসভায় থেকে, ওদের নানা বিল পাশে এই সেদিনও সংসদে সাহায্য করেও সাম্প্রদায়িক না। প্রিয়াঙ্কা ভূমিপূজনের সমর্থনে টুইট করেও সাম্প্রদায়িক না। রাহুল মন্দিরে মন্দিরে পুজো দিয়েও সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করেন না। অধীর NIA -বিজেপির বয়ানে নিজের জেলার মুসলিমদের বিনা প্রমানে সন্ত্রাসী বলেও সাম্প্রদায়িক না। বামেরা বাংলার মুসলিমদের সাচার রিপোর্টে প্রথম স্থানে জায়গা করে দিয়ে ওদের জায়গা-জমি ছিনিয়ে, এখন বিজেপির ক্যাডার সাপ্লাই এজেন্সীতে পরিণত হয়েও সাম্প্রদায়িক না। এরা সবাই বাবরি–ভূমিপূজন-উমর খালিদ-সাফুরা-শার্জিল-তাবলীগ সবেই কৌশলগত নীরবতা পালন করবে, প্রতি বড়দিনে মমতা-কংগ্রেস সবাই নেল্লি-বাবরির কুখ্যাত নায়ক বাজপেয়ির জন্মদিনে সামাজিক মাধ্যমে ভক্তি প্রকাশ করবে– তারপরও এদের জন্মের সময় নেয়া বর্ণপ্রথার টিকা এদের সাম্প্রদায়িক বলতে দেবেনা কাউকে। মুসলিমদের কাজ হল বিনা প্রশ্নে অনুগত দাসের মত কেজরিওয়াল-সিন্ধিয়াদের জেতানো– তারপর তারা কেউ দল বদলে ,কেউ না বদলে মোদির সেবা করলেও প্রশ্ন না তোলা। তৃণমূল থেকে মুকুল-শঙ্কুদেব-সৌমিত্র-অনুপমরা যতই বিজেপিতে যাক, তার দায় তো মমতার না ! কাননের জন্য তো দরজা খোলা- ইচ্ছে হলে যাবে, ইচ্ছে হলে আসবে– বিজেপির সঙ্গে আবার ছুৎ-অচ্ছুৎ কি ! যাঁরা দলে সব পদ পেয়েও এখনো পা বাড়িয়ে, তারা সব বিজেপিতে গেলেও সেটা সাম্প্রদায়িকতার জন্য না — অভিষেক-পিকের প্রতিক্রিয়ায় ! অমুসলিম বাঙালি আবার সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক হয় নাকি ?

এনআরসির প্রথম টার্গেট তো বাংলা । জামিয়া আর আলীগড়কে কেন মুখ্য ভূমিকায় দেখা গেল এসবের প্রতিবাদের ? এগুলো কি নেহাতই মুসলিম ইস্যু, না দেশের ধর্মনিরপেক্ষতা, সংবিধান বাঁচানোর প্রশ্ন ? এত প্যারিস ৬৮-কিউবা-কাস্ত্রো-ভিয়েতনাম-খাদ্য আন্দোলন চর্চা করা বাঙালির দু’একটা মিছিল বাদে সারা বাংলা গর্জে উঠলো না কেন ? ছাপিয়ে গেল না কেন জামিয়ার প্রতিবাদকেও ? শুধু মুসলিমদেরই কেন পার্ক সার্কাস -আসানসোল-জঙ্গিপুর – বহরমপুরে ‘শাহীন বাগ’-এর আয়োজকের ভূমিকায় দেখা গেল ? সেটাই একটু বুড়ি ছোয়াঁ দিয়ে প্রতিবাদকারীদের হাতে মেহেদী লাগালেই বা টিভির মাইকে বাইট দিলেই দায়িত্ব শেষ ? আজকের খগেন মুর্মু এর আগে কোন দলের নেতা ছিল, কোন কোন ভাই-বোনের ভোট কাটাকাটিতে সে বিজেপির সাংসদ হল ? ওবিসি সংরক্ষণ লাগু করতে এলিট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর এত উন্নাসিকতা কোন স্পর্ধায় ? একটাও মুসলিম জেলা সভাপতি পাওয়া যায়না কেন সংগঠনে ? গেলেও শুধু মুসলিম জেলাতেই কেন? কাউকে মেয়র বা এমপি করলে তাঁকে পুজো দিয়ে আর নিজের বাড়ির অন্তঃধর্ম বিবাহের ফিরিস্তি দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতার পরীক্ষা দিতে হয় কেন? ওয়াকফ আর সংখ্যালঘু কমিশন বাদে দূরবীন দিয়ে খুঁজতে হয় কেন মুসলিম সদস্য ?

গণতন্ত্রে প্রশ্ন করা মানেই ভোট কাটা নয়। প্রশ্ন উঠছে কারণ মুসলিমদের উপরই কাল থেকে রাজ্যের ধর্মনিরপেক্ষতা থেকে ভোট-ভাগ হওয়ার সব দায় চেপে বসেছে ! অথচ এরা কেউ-ই দাবি করেনি ইমাম-পুরোহিত ভাতার, এমনকি এখনও মিমে নামও লেখায়নি । তার আগেই প্রশ্নবানে জর্জরিত । আদতে চাপে রাখা -নিম্নবর্ণের ধর্মান্তরিত গোলামরা আবার লুঙ্গি পরে বিধানসভা ভরিয়ে না দেয় সেই আশঙ্কা থেকে। বামেদের সময় মুসলিমদের পলিটিক্যাল এজেন্সি নাকচের যুক্তি ছিল ‘আউডেন্টিটি পলিটিক্স’ হয়ে যাবে । সেটাই আবার দলিতদের ক্ষমতায়ন নিয়ে মায়াবতী-কাশীরাম করলে তাঁরা কিন্তু মসিহা ! ম্যালকম এক্স ভাগ্যিস ভারতে জন্মায়নি ! যাইহোক, প্রশ্নগুলোর উত্তর আপনি সীমাঞ্চলে গিয়ে বা নিজের রাজ্যেই পাশের পাড়ার লোকের কাছ থেকে শুনবেন নাকি এড়িয়ে গিয়ে নিজের উত্তরেই ফেসবুক কাঁপাবেন– সেটা আপনার ব্যাপার। কিন্তু আপনি যখন ব্যাখ্যা করবেন , তখন সবদিক বিচার করেই করবেন এটা আশা করাই যায়। আর ভোট কেটে কার লাভ ? ভাবি মুখ্যমন্ত্রী তো বলেই দিয়েছে– এনআরসি তালিকায় তো নাম না এলেও আপনার কিছু ভয় নেই। বিজেপির বিরোধিতা করছেন এটা তো আপনার উদারতা– নাগপুরের অসভ্য হিন্দুত্ব বনাম বেঙ্গল স্কুল অফ সফিস্টিকেটেড হিন্দুইজমের সংঘাতের দাবি হিসেবেই।

ওয়াইসি আসার আগে প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করুন। যাঁরা এত বছর আপনাদের ভোট দিলই না শুধু, ভোটের দিন প্রাণও দিল–তাঁরা একদিন সকালে হঠাৎ বিজেপির সহযোগী ভোট-কাটুয়া দলের কর্মী হয়ে গেল– তাও এমন সময় যখন বিজেপি ক্ষমতায় এলে তাঁরাই সবার আগে হিংসার শিকার হওয়ার আশঙ্কা– এতবড় ফেনমেনা বোঝার চেষ্টা করবেন না ? তবে কি লাভ হল এত রবীন্দ্র- সত্যজিৎ চর্চা করে, ঘরে বাইরে দেখে ? নাকি বিজেপির প্রতর্ক-পরিভাষা ধার নিয়েই ‘মৌলবাদি’, ‘কট্টরপন্থি’, ‘সাম্প্রদায়িক’ এসব বয়ানেই দেখবেন পুরো ব্যাপারটা ? মুসলিমরা বুলেটের বিকল্প প্রত্যাখ্যান করে ব্যালটের রাস্তায় আন্দোলন করলেও সেই একই সরলীকরণ? বিশ্লেষণ-এ কোনও ফারাক করবেন না ? এই ন্যারেটিভ বাজারে গরম হলে কার লাভ আখেরে ভেবে দেখেছেন ? এতদিন তো ‘ভোট-ব্যাংক’ (যে ব্যাংককে ছাড়াই একটা দল ১৮ টি আসন জিতে যায় লোকসভা ভোটে !) হিসেবেই দেখলেন, এবার তাঁদের প্রতিবেশী হিসাবেই না হয় মান-অভিমান-সমীকরণগুলো বোঝার চেষ্টা করলেন একদিন, একবেলা । আর হ্যাঁ, আপনারা জোটটা কবে করবেন ? আজকে তো ভুলেই গেলেন অর্ণবের বেল পাওয়া নিয়ে লিখতে ! নাকি ওসব না করলেও মার্কড সেফ ফ্রম ‘ভোট-কাটুয়া’ ক্লিক করেই সব উতরে যাবেন ?”

Facebook Comments