ত্রিপুরার জয় কি বিজেপি’র কাঁটা হয়ে দাঁড়াবে

ত্রিপুরার জয় কি বিজেপি’র কাঁটা হয়ে দাঁড়াবে

চৌধুরী আতিকুর রহমান, বেঙ্গল রিপোর্ট:৩-রা মার্চ উত্তর পূর্বের তিনটি রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের ফল বার হল। বুথ ফেরত সমীক্ষায় যা ফলাফল বলা হয়েছিল তাই হয়েছে। অনেকে ভাববেন ত্রিপুরাতে বিস্ময়কর ফল হল কি করে? প্রকৃতপক্ষে বিজেপি ত্রিপুরার মানুষদের নিয়ে ব্যাপক হোমওয়ার্ক করে সিপিএমকে হারিয়ে দিয়েছে। মানুষের ক্ষোভ নিরসণের বহু স্বপ্ন বিলি করেছে। শুধু ত্রিপরা নয় গো রাজনীতি করে যার উত্থান সেই বিজেপি নাগাল্যান্ড-নেঘালয়ের খ্রিস্টান গরুখেকো মানুষদের ক্ষেত্রে গোমাতা নিধনের পাপকেও মেনে নিয়েছে। এই হল বিজেপি, দেদার স্বপ্নের ফেরিওযালা।

Deenikart Halal Store

আমার এক বন্ধু তাঁর এক বন্ধুর মুখে শোনা একটা সত্য কাহিনি শুনিয়েছিলেন, ১৯৯৪ সালে হাওড়ার পদ্মপুকুরের “বিজন রায়” আমাকে বলেছিলেন “ত্রিপুরা আগরতলাতে নিজের চোখে দেখেছে একজন মুসলিম দাড়িওয়ালা চাচা হেট হয়ে শব্জী কিনছে। ভরা বাজারে তাকে পিছন থেকে কে একজন লাথি দিয়ে ফেলে দিলো! চাচা তাকে খুঁজে পেলোনা।….” আমি তাকে খুঁজে পেয়েছিলাম তখনই। বিজেপি তাদের খুঁজে খুঁজে একত্রিত করে আজ সামনে নিয়ে চলে এলো!

জ্ঞান হওয়া থেকে সাম্প্রদায়িকতার বীভৎস রঙের অনেক খবর রাখি। ভারতের দুঃখ, এক শ্রেণীর মানুষ নিজেই জানেনা তার ভিতর বিভৎস সাম্প্রদায়িকতা সর্বদা তাকে চালিত রেখেছে। আমি বলব দেশ ভাগ সীমান্তবর্তী বেশ কিছু মানুষের মনে চিরস্থায়ী বিদ্বেষ রেখে গেছে, যা কয়েক পুরুষ পর হয়তো স্তিমিত হবে।

এই বক্তব্যের সহায়ক তথ্য হল। ১৯৪৭-এ ভারত স্বাধীন হলেও ১০৪৯-এ ভারতভুক্তির আগে পরে ত্রিপুরায় দলে দলে বাঙালি হিন্দুরা শরনার্থি হয়ে এসে স্থানীয় ভূমিপুত্র আদিবাসীদের সংখ্যালঘু করে দেয়। এমনকি ১৯৭১-এও বহু বাঙালি হিন্দু বাংলাদেশ থেকে ত্রিপুরায় আসে, যেমনটি চলছে পশ্চিমবঙ্গে। ত্রিপুরায় ভূমিপূত্র মুসলিমও আছে। তবে অমুসলিম ভূমিপুত্র আদিবাসীদের সংখ্যালঘু হওয়ার এই ক্ষোভ কাজে লাগিয়ে বিজেপি আইপিএফটি (ইন্ডিজেনাস পিপলস ফ্রন্ট অফ ত্রিপুরা)-র সঙ্গে জোট করে। এদের মধ্যে এমনকি রাজ্যের প্রাচীন নাম টিপ্পেরা হরনের ক্ষোভও রয়েছে। আবার বিজেপি পূর্ববঙ্গ আগত বাঙালি হিন্দুদের চিরকালিন মুসলিম বিরোধিতাকে কাজে লাগায়। বিজেপি তাদেরই দল, এই মনোভাব থেকে পূর্ববঙ্গীয় বাঙালি হিন্দুরা বিজেপিকে ভোট দিয়েছে। উভয় বিপরীতমুখি জনজাতিকে স্বপ্ন দেখিয়ে কব্জা করতে বিজেপিই পারে। কারণ, তাদের ঝুলিতে বহু স্বপ্ন। ২৫ বছরের বাম শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতাও কিছুটা কাজ করেছিল।

২০১৬-তে আসামে বিজেপি জেতার পিছনে ছিল আসামবাসীর চোখে সেখানকার অবৈধ বাংলাদেশি (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান)-দের বিতাড়নের শ্লোগান দিয়ে। ত্রিপুরাতে যদিও বাঙালির সংখ্যা বেশি সেখানেও একই ডাক দিয়ে আদিবাসীদের মন জয়ের চেষ্টা করা হয়। দুটি ক্ষেত্রেই, অহমিযাভাষীদের সংখ্যালঘু হয়ে যাওয়ার ও ত্রিপুরার মূলবাসীদের সংখ্যালঘু হয়ে যাওয়ার ভয়কে পুঁজি করা হয়েছিল। যদিও আর এস এস-এর সমস্ত ভারতে হিন্দুদের সংখ্যালঘু হয়ে যাওযার একটা অলিক প্রচার আছে।

আসামের ক্ষেত্রে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ ও অন্য কয়েকটি সংগঠনের দীর্ঘ লড়াই পঞ্চা্য়েতের শংসাপত্রকে মান্যতা দেওয়ায় বিজেপি থমকে দাঁড়িয়ে গেছে। তবে অগপর বঙ্গাল খেদাওয়ের শ্লোগান দিয়ে উত্থান ও মুখ থুবড়ে পড়া বিজেপির ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে মুখ থুবড়ে পড়া সময়ের অপেক্ষা। যদিও পঞ্চায়েত একটি তালিকা বার করেছে যাতে বাদ পড়ে যাওয়া আসামের বহু মুসলিম রাজনৈতিক নেতাও আছেন তেমনই অধ্যাপকের মত বাঙলাভাষী হিন্দুও আছেন। কিন্তু ত্রিপুরাতে বাঙালি হিন্দুরাই তো সংখ্যাগুরু প্রায় ৬৬ শতাংশ এবং তাঁরা এসেছেন স্বাধীনতার সময় বা পরে এমনকি ১৯৭১-এ বাংলাদেশ তৈরী হওয়ার পরও। এদের ক্ষেত্রে অনুপ্রবেশ রদ গুজবটি সাঙ্ঘর্ষিক হলেও এটাই কাজ করল কি করে ?…বিজেপি অথচ সাম্প্রদায়িক তাস খেলবে না এটা কল্পনাতেও আনা উচিত নয়। তারা একটি বিল আনার কথা বাতাসে ভাষিয়ে রেখেছে যা ১৯৫৫-র নাগরিকত্ব বিলটির ধর্মনিরেপেক্ষ চরিত্রটিকেই বদলে দেবে। বিলটিতে রয়েছে যে সকল হিন্দু ভারতে এসেছে তাদের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে কিন্তু কোন অহিন্দুকে নয়। ত্রিপুরার শরনার্থী বাঙালিরা তা লুফে নিয়েছে। নাগরিকত্ব পাওযার এই সহজ পন্থাটিকে লুফে নিয়ে তারা বিজেপিকে রক্ষাকর্তা মনে করেছে। এমনিতেই পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশ ছেড়ে চলে আসায় তারা মুসলিমদের প্রতি নেতিবাচক।

ত্রিপুরায় ভূমিপুত্র স্থানীয় মোঙ্গলয়েড চেহারার আদিবাসীরা যাদের রাজা ছিলেন মাণিক্য রাজারা। মুসলিমরাও ভূমিপুত্র যারা এখন ৮ শতাংশ হলেও স্বাধীনতার পর এককালে সংখ্যায় ২৯ শতাংশও ছিল। শরনার্থী চাপে এবং বাংলাদেশ চলে যাওয়ায় ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এই আদিবাসী অমুসলিম ভূমিপুত্ররা শতকরা হিসাবে প্রতি শতে ৩০ জন। এদের মধ্যে অধিকাংশই হিন্দু ধর্মাবলম্বি।.কোকবরক ভাষী ত্রিপুরি, জামাতিয়া, মণিপুরি, রাংখালরা এদের মধ্যেই পড়ে। এদিকে গারো, কুকি, লুসাইরা খ্রিস্টান, মগ ও চাকমারা বৌদ্ধ। আদিবাসী ও বাঙালি মিলে হিন্দু ৮৩ শতাংশ। বিজেপি আদিবাসীদের ভিন্ন রাজ্য দেওয়ার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

বিজয় রাংখাল বলেই দিয়েছেন পূর্ববঙ্গীয়দের অবাধে আসার ফলে আমরাই এখন নিজভূমে পরবাসী। এখন প্রশ্ন, আদিবাসীদের জন্যে বিজেপি পৃথক রাজ্য দিতে পারে কিনা? এমনকি ৩০ শতাংশ আদিবাসীর কয়েকটি গোষ্ঠী ভিন্ন রাজ্যের জন্যে ৭০ শতাংশ জমিও চেয়ে ফেলেছে। কোন গবেষণা না করেই বলা যায়, প্রতিশ্রুতি রাখা অত সহজ নয়। ৬৬ শতাংশ বাঙালির এটাই এখন মাতৃভূমি তাই তারাও ছেড়ে কথা কইবে না। আসামের মন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকারকে বলেই দিয়েছেন পষ্চিম বাংলা বা বাংলাদেশে চলে যেতে। এর তাৎপর্য হল ত্রিপুরার পূর্ববঙ্গ আগতদের আসামের মতই ঝাড়াইবাছাই চলবে। দেখা যাক, ফেরিওয়ালা কার স্বপ্ন কতটা পূরণ করতে পারে। এর আগে বলেছি বিজেপি মানে বিভাজন। শিবমন্দিরে মগ গরুর কাটা মাথা রেখে ধরা না পড়ে গেলে হয়তো ৮% মুসলিমের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলে আরও একটা বিভাজনের চেষ্টা হত।

বিজেপি আদিবাসী দলটির সঙ্গে জোট করে লাভবান হয়েছে। আদিবাসীদের জন্যে ২০ টি বিধানসভা আসন সংরক্ষিত। আইপিএফটি দলটির সঙ্গে আঁতাত করে আদিবাসী আসনগুলির ৯ টি বিজেপি পেয়েছে 8 টি আইপিএফটি। শহরাঞ্চলে বিজেপি ২৩ টি আসন পেয়েছে, সঙ্গি দলটি ২ টি, সিপিএম মাত্র চারটি। তাই বলা যেতে পারে শহরাঞ্চলে বাঙালি হিন্দুরা বিজেপিকে প্রাণখুলে ভোট দিয়েছে। গ্রামের দিকে বিজেপি ১২ টি আসন পেয়ে সামান্য দুর্বলতা দেখিয়েছে। সহযোগি দলটি পেয়েছে ৬ টি, সিপিএম শহরের তুলনায় অপেক্ষাকৃত ভালো ফল করে ১২ টি আসন পেয়েছে।

ধর্মনিরেপেক্ষ দলগুলির নিজেদের মধ্যে ভোট কাটাকাটি খুব একটা হয়নি। দেখা গেছে ভোট কাটাকাটিতে মাত্র তিনটি আসন বিজেপির কাছে গেছে। তৃণমূল পেয়েছে মোট ৬ হাজারের মত ভোট। কংগ্রেস ৩৭ হাজার। সিপিএম , ফরোয়ার্ড ব্লক, আরএসপি, সিপিআই মোট ভোট পেয়েছে ৯ লাখের মত। সে জায়গায় বিজেপি জোট পেয়েছে ১০.৫ লাখ ভোট। অর্থাৎ বাম-বিজেপির ভোট পাওয়ার ব্যবধান ১.৫ লাখ। সেই জায়গায় কংগ্রেস ও তৃমমূল একত্রে পেয়েছে সাকুল্যে ৪৩ হাজার ভোট। তাই ভোট কাটাকাটি হয়নি। একদা বিরোধী কংগ্রেসের এই হাল কেন হল? কারণটি হল বিজেপি কংগ্রেসের বেশ কিছু নেতাকে হাতিয়ে নিয়ে তাদের প্রার্থী করেছিল। তাই কংগ্রেসের সংগঠনটাই নেই।

বাংলার প্রেক্ষিতে ত্রিপুরার ভোটপর্ব ও বিজেপির বিজয়লাভ বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, উভয়রাজ্যের সিংহভাগ মানুষ বাংলাভাষী। উভয় রাজ্যেই পূর্ববঙ্গ আগত মানুষ রয়েছে। যদিও বাংলার ক্ষেত্রে নদিয়া, উ. ২৪ পরগণার মত সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতেই তা সীমাবদ্ধ। অন্তত্ত ভোটের ক্ষেত্রে বিশাল সংখ্যক দেশজ হিন্দু ও মুসলিমের কাছে এদের উপস্থিতি খুব একটা প্রভাব ফেলে না। তাই পূর্ববঙ্গ আগত শরনার্থী সমস্যা এখানে কয়েকটি সীমান্তবর্তী জেলা ছাড়া অন্যত্র প্রায় নেই। তবে ১৯৫৫-র ধর্মনিরেপেক্ষ নাগরিকত্ব বিলের সংশোধন ত্রিপুরা অপেক্ষা বাংলার হিন্দুদের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য। কারণ, এখানে শতকরা হিসাবে ত্রিপুরা অপেক্ষা মুসলিম সংখ্যা ৩.৫ গুণ বেশি। আরও একটা বিষয় যা ত্রিপুরা ও বাংলার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রজোয্য। সেটা হল বাংলা ও ত্রিপুরা উভয় রাজ্যে বিজেপির রমরমা ছোট শহর ও শহর ঘেঁষা এলাকায় বেশি। তবে বাংলার বিস্তীর্ণ গ্রামীণ এলাকায় বিজেপির অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। তাই বিজেপির বাংলা জয় একপ্রকার অসম্ভব।

তবে দার্জিলিং-এ গোর্খাল্যান্ডের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোটে জিতে বিজেপি যেমন ন্যাজেগোবরে হয়েছে। না ঘরকা না ঘাটকা হয়ে গেছে। গোর্খাল্যান্ড দিলে সমতলের বাঙালিরা বিজেপিকে বাংলা ছাড়া করে দেবে। আবার গোর্খাল্যান্ড না দিলে পাহাড়ের মানুষ বিজেপির দুঃস্বপ্নের কারণ হবে। তেমনই আদি টিপ্পেরাবাসীদের কাছে দেওয়া ভিন্ন রাজ্যের প্রতিশ্রুতি রাখতে না পেরে একই হাল হবে। আবার প্রতিশ্রুতি রাখলে সংখ্যাগুরু বাঙালি বিজেপিকে কি বলবে বা করবে অনুমান করা যায়। বিজেপি ধর্ম ও জাতপাতের উপর নির্ভর করে জিতেছে কিন্তু অচিরেই সেই স্বপ্ন তার কাছে দুঃস্বপ্ন হয়ে আসছে।

Facebook Comments