তরুণ তপস্বী উজাইর সিদ্দিকী প্রথম হয়েছে খবর শুনে এতটুকুও আশ্চর্য হইনি: কলম ধরলেন ইসমাইল দরবেশ

তরুণ তপস্বী উজাইর সিদ্দিকী প্রথম হয়েছে খবর শুনে এতটুকুও আশ্চর্য হইনি: কলম ধরলেন ইসমাইল দরবেশ

পাঠকের কলমে, বেঙ্গল রিপোর্ট:
না, খবরটি পেয়ে এতটুকুও অবাক হলাম না। আনন্দ পেয়েছি অত্যন্ত। উজাইর ভাইয়ের কথা বলছি। যাকে আমি বলি, তরুণ তপস্বী। সে একটি কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলেছে। এটা ঠিক কাণ্ড কি না, আপনারাই বলবেন। জানবেন, কেন অবাক হইনি আমি। মাদ্রাসা বোর্ডের ফাজিল (উচ্চ মাধ্যমিক) পরীক্ষায় সে সারা রাজ্যের মধ্যে যুগ্মভাবে প্রথম স্থান অধিকার করেছে।
কেন এই ছেলেটিকে আপনি এত স্নেহ করেন? আপনাদের পীরজাদা বলে? এমন প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছি অনেকবার। পীরজাদা তো বটেই; কিন্তু কেন তাকে ভালোবাসি তা কীভাবে বোঝাবো তাদের? বোঝানোর তেমন প্রয়োজনও মনে করিনি অবশ্য। পাঁচ-ছয় বছর আগে এই ছেলের বয়স কতই বা হবে। কৈশোর উত্তীর্ণ সদ্য তরণ। কিন্তু বিষয় ভিত্তিক পড়াশোনা, ইসলামি থিওলজির ইলম অবাক করে তুলেছিল। আশ্চর্য হয়েছিলাম পড়াশোনার ব্যাপকতা দেখে। আমার ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে তার বিশ্বাস অবিশ্বাস্য রকমের মিল। ফলে এই ভালবাসাবাসি।

আলিম পরীক্ষা। ছেলেটা ক্লাসের পড়াশোনা করে না। পরীক্ষার সময় সাহিত্য পড়ে। তুলনামূলক সাহিত্য। পড়া তো নয়, গেলা। রাত দিন পড়া। কোথায় ওর বই নেই। স্কুটির ডাব্বায়, বাগানের বেঞ্চের নিচে, বালিশের তলায়। সেলুনে চুল কাটতে গেলেও হাতে থাকে বই। আমি জানতে চেয়েছিলাম — বাথরুমে? হেসে ফেলেছিল সে। একজন ছাত্রের উচিত তার ক্লাসের পড়াশোনা করা। ছাত্রানাং অধ্যায়নাং তপঃ এমন একটি শ্লোক আছে না? সেটাই। কিন্তু পরীক্ষার সময় আলতুফালতু এসব পড়া কেন? একটু ধমক দিয়ে ছিলাম বোধহয়। উজাইর বললো — ওর নাকি এই শিক্ষা ব্যবস্থা, ইঁদুর দৌড়ের পরীক্ষার প্রতি এতটুকুও আগ্রহ নেই। বাড়ির চাপে ক্লাসে আছে। এই নিয়ে অনেক অনেক কথা। আলিম পরীক্ষার ফলাফল ওর মেধা অনুযায়ী আশানুরূপ না হওয়ায় সেদিন আরও একবার রাগ করলাম। ও তখনও ওর কথায় অবিচল। এই সব পরীক্ষা, রেজাল্ট – এ সবে ওর কোনও আগ্রহ নেই। অনেক সময় মনে হয়েছে ওর কথা সঠিক। কিন্তু দুনিয়াদারি রেওয়াজ। তোমার মেধার মূল্যায়ন করা হবে রেজাল্টে। সেদিন খুব সংক্ষেপে আমাকে আশ্বস্ত করে বলেছিল — আচ্ছা দাদা, এবার একটু ক্লাসের পড়া করবো, দেখবেন! কখন যে ক্লাসের পড়া করেছে, তা জানি না। ওর এই ‘একটু’ পড়াশোনাতেই এ বছর মাদ্রাসা বোর্ডের ফাজিল পরীক্ষায় যুগ্মভাবে প্রথম স্থান অধিকার করেছে সারা রাজ্যের মধ্যে। এটা একটি কাণ্ডই বটে।

আমি আজ কলকাতায় গিয়েছিলাম। নতুন গতির অফিসেও গেলাম একবার। বেশ কয়েকজনের ফোন এলো। দাদা, উজাইর সিদ্দিকীর নাম্বারটা দেবেন? তিন নং ফোন আসতে একটু অবাক হলাম। চা খেতে দাঁড়িয়েছি এক জায়গায়। ফোনের নেট অন করলাম। অন করতেই খবরটি পেলাম। ফোন দিলাম উজাইরকে। খুশি হলাম খুব, কিন্তু বিশ্বাস করুন এতটুকুও আশ্চর্য হইনি। উজাইর ভাইয়ের প্রথম হওয়ার খবর, আমার কাছে এতটাই স্বাভাবিক ঘটনা যে ওর কাছ থেকে খবর পেয়ে সুড়ুৎ করে আরেক ঢোঁক চায়ে চুমুক দিলাম। খুব সাধারণ একটি ঘটনা — যে উজাইর ভাই প্রথম হয়েছে। উজাইর ভাইয়ের প্রতি রবি ঠাকুরের যে কথাটি প্রায় কোটেশন হিসেবে ব্যবহার করি, সেটাই বলি।

“ওরে সবুজ ওরে আমার কাঁচা
আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা”

লিখছেন: ইসমাইল দরবেশ

Facebook Comments